
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে কারফিউ জারি হলে বেচাকেনা বন্ধ হয় তার। টানা চার দিন বেকার বসে থাকায় তার পকেটে পড়েছে টান।
বারেক বলছিলেন, “অনেক আশা নিয়ে বুধবার থেকে দোকান চালু করছি। কিন্তু ক্রেতা নেই। আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরের আগে খুলে বিকাল হয়ে গেল, মাত্র তিনজন ক্রেতা পাইছি।”
সপ্তাহখানেক ধরে বারেকের মতই অবস্থা হরিলাল হৃদয়ের; মানিকনগরে থাকলেও প্রতিদিন গুলিস্তানের সমবায় টুইন টাওয়ারের সামনে জুতা সেলাই করেন তিনি। টানাপড়েনের সংসারে চারজনের আহার জোগাতেই তার করুণ দশা। এর মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলন আর কারফিউ যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। সাত দিন বাসায় বসেই কেটেছে তার।
হরিলাল বলেন, “গত ছয়-সাতদিন পরিবার নিয়া খুব কষ্ট করছি। দিন আনি দিন খাওয়া লোক আমি। হাতে জমানো টাকাও নাই যে, হরতাল-কারফুর (কারফিউ) সাত দিন সংসার চালামু। এই কয়ডা দিন পোলাপান নিয়া খালি আলুর তরকারি দিয়া ভাত খাইছি।
অভাব অনটনের সংসারে হরিলালের দুই ছেলে পড়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে। ছেলেদের খরচ মিটিয়ে চারজনের সংসার চালাতে তার হিমশিম অবস্থা। ফলে একদিন বসে থাকলে পেট চলে না হরিলাল আর বারেকদের।
হাই কোর্টের রায়ে পর জুলাইয়ের শুরু থেকে কোটা বাতিলের আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে আরও অনেক স্থানে। পরে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন কর্মসূচিকে ঘিরে এক পর্যায়ে তা সহিংসতায় গড়ায়।
আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাতের মধ্যে এক সপ্তাহে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর আসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে দেশজুড়ে কারফিউ শুরু হয়। এখন প্রতিদিনই কয়েক ঘণ্টা করে কারিফিউ শিথিল করা হয়েছে।
উত্তপ্ত পরিস্থিতি আর কারফিউয়ের কারণে সপ্তাহখানেক বিক্রি বন্ধ রাখেন গুলিস্তানের ভ্রাম্যমাণ কাপড় বিক্রেতা মো. রাশেদ। পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে ফের বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।
রাশেদ বলেন, “সকালে দোকানডা খুললাম। দুপুর হইয়া গেল মাত্র দুইজন ক্রেতা পাইছি। রাস্তায় গাড়ি আছে ঠিকই। কিন্তু খুব দরকার ছাড়া মানুষজন এখনও বাইর বের হয় না।”
দুপুর সোয়া ১২টায় রাশেদের পাশেই দোকান খুলছিলেন ইব্রাহিম হাওলাদার। ঘণ্টাখানেক পর সেখানে গিয়ে জানা গেল, ক্রেতা পাননি একজনও।
ইব্রাহিম বলেন, “এক ঘণ্টায় একজন ক্রেতাও মিলল না কপালে। ক্রেতার চেয়ে দোকানিই বেশি। আর যে অল্প কয়েক ক্রেতা ঘুরতেছে, তারা কাপড় কিনবে আর কী, হয়ত অন্য কাজে আইছে।”
হৃদয় বলেন, “থাকি কেরানীগঞ্জে। সেখান থেকে তো এখানে আসাই যায় নাই। রাস্তায় বের হইলে আতঙ্কে থাকা লাগছে। হয় আন্দোলনকারীদের, না হয় পুলিশের। আবার কারফিউ শুরুর পরে তো গাড়িই চলে না।”
হৃদয়ের ভাষ্য, “বেচাকেনা বন্ধ থাকায় কেমন অবস্থা গেছে তা খালি আমরাই জানি। বেচাকেনা বন্ধ থাকলেও খাওয়া-দাওয়া তো আর বন্ধ থাকে না। বাজারে সবজির যে দাম, কেমন গেছে তা বুঝানোর মত না। আর কয়ডা দিন এভাবে গেলে না খেয়ে মরার অবস্থা হবে।”
তার পাশেই ইফাদ হোসেনের ছোট দোকান, বিক্রি করেন মোবাইল সামগ্রী। তবে কারফিউয়ের কারণে শুক্রবার থেকেই দোকান বন্ধ রাখেন তিনি।
“পাঁচ দিন দোকান বন্ধ ছিল। এই পাঁচ দিন মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলছি। এখন হাজিরা দিয়া সেই টাকা শোধ করতে হইব,” বলেন ইফাদ।







































