
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ নিরোধ, মানবপাচার রোধ, লিগ্যাল এইড সুবিধা প্রাপ্তি এবং ভোটার হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১১ জানুয়ারী) বিকেলে সরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে আয়োজিত এই সমাবেশে এলাকার সরকারি ভাতাভোগী নারী, কিশোরী, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন। এরপূর্বে অনুরুপ সভা তালার নগরঘাটায় অনুষ্ঠিত হয়।সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক হাসান। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলার উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এই তিন স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের সবাইকে আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।তিনি আরও বলেন, সরকার বিনামূল্যে লিগ্যাল এইড সেবা দিচ্ছে। কিন্তু অনেক নারী জানেন না কীভাবে এই সেবা পাওয়া যায়। এই সমাবেশের মাধ্যমে নারীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, তবেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নিজের ভোটাধিকার সচেতনভাবে প্রয়োগ করা। বিশেষ করে নারীদের বলবো ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করুন। আপনার একটি ভোটই পারে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের পথ সুগম করতে। কেউ যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে যে কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হলে তাতেও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। কারণ গণভোট জনগণের সরাসরি মত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। ভোটের মাধ্যমে আমরা শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করি না, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করি।মিজ আফরোজা বলেন, ভোটকেন্দ্রে পরিবারকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। একজন সচেতন নারী চাইলে স্বামী, সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। পরিবার থেকেই গণতান্ত্রিক চর্চার শুরু হয়। নারীরা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে ভোটের উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই বাড়বে। শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়তে নারীদের এই নেতৃত্ব অপরিহার্য।নারীদের উপর নির্যাতন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, নারী নির্যাতন রোধের দায়িত্ব শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরই আগে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবার ও সমাজে পুরুষরা যদি সচেতন ভূমিকা পালন করেন, তবে নির্যাতনের শিকড় দুর্বল হয়ে পড়বে। একজন বাবা, ভাই বা স্বামী হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণই পারে একটি মেয়ের জীবন নিরাপদ করতে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা নিজেও একটি অপরাধ। তাই সবাইকে সাহস নিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে।বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলার উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নয়, আইনি সচেতনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণও ক্ষমতায়নের অংশ। নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে রিপোর্ট করতে হবে।তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ ও মানবপাচার প্রতিরোধে কিশোরীদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন রক্ষা মানেই একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ রক্ষা।অনুষ্ঠানের শেষাংশে অংশগ্রহণকারী নারীরা বাল্যবিবাহ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বক্তারা বলেন, সচেতন নারীই পারে একটি নিরাপদ সমাজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। নীরবতার ভেতর থেকেও কখনো কখনো উঠে আসে আশার শব্দ। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, ন্যায়ের অধিকার এবং সম্মানজনক জীবনের প্রত্যয়ে সাতক্ষীরার তালায় এক শান্ত অথচ দৃঢ় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উচ্চকণ্ঠের বদলে ছিল সচেতনতার আলো, অভিযোগের বদলে ছিল সমাধানের পথ। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মিলিত উপস্থিতি যেন আস্থার সেতু গড়ে তোলে। বাল্যবিবাহ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।





























