
নাহিদ ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো: “দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি—প্রাণিসম্পদের হবে উন্নতি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে উদযাপিত হলো জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ও প্রদর্শনী–২০২৫।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকালে প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিকায়ন ও লাভজনক করে তুলতে দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে আধুনিক প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রান্তিক খামারিদের একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন,“প্রাণিসম্পদ খাত শক্তিশালী হলেই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরও মজবুত ভিত্তি পাবে।”
অনুষ্ঠানে স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শায়লা শারমিন বলেন,“‘দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি—প্রাণিসম্পদের হবে উন্নতি’ শুধুই একটি স্লোগান নয়, এটি বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি কার্যকর রূপরেখা। আমাদের প্রাণিসম্পদ খাতকে টেকসই, লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে দেশীয় জাত সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান দেশীয় গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য প্রাণিসম্পদ প্রজাতি আমাদের জলবায়ু, রোগসহনশীলতা এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব দেশীয় জাত প্রাকৃতিকভাবেই কম খরচে লালনযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কৌশল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এসব জাত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ডা. শায়লা শারমিন আরও বলেন,“আমরা যদি দেশীয় জাত সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি, উন্নত জাত উন্নয়ন কর্মসূচি, আধুনিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ভেটেরিনারি সেবা ডিজিটালাইজেশন এবং স্মার্ট খামার ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”
তিনি বিশেষভাবে ডিজিটাল খামার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে খামারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য পরিকল্পনা, রোগ প্রতিরোধ এবং বাজার সংযোগ একত্রে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে খামারিরা যেমন উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারছেন, তেমনি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ দপ্তর খামারিদের পাশে দাঁড়িয়ে নিয়মিত টিকাদান, পরামর্শ সেবা, রোগ নির্ণয় ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন নিশ্চিত করাও এই খাতের অন্যতম লক্ষ্য।
ডা. শারমিন প্রধান অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,“এই খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে নীতিগত সহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ, খামারিদের সহজ ঋণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রাণিসম্পদ বিপ্লবকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
তিনি খামারিদের উদ্দেশে বলেন,“খামারিরাই প্রাণিসম্পদ খাতের প্রকৃত চালিকাশক্তি। তাদের শ্রম, ধৈর্য ও অবদান ছাড়া দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কল্পনাই করা যায় না। বর্তমান সরকারের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নবান্ধব নীতি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে খামারিরা চাইলে নিজেদের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন।”
পরিশেষে ডা. শায়লা শারমিন বলেন,“জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের মাধ্যমে আমরা শুধু একটি আয়োজন করছি না; আমরা প্রাণিসম্পদ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।”
তিনি এই আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতাকারী উপজেলা প্রশাসন, এলডিডিপি প্রকল্প, খামারি, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সকাল ১০টায় শুরু হওয়া কর্মসূচিতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্থাপিত বিভিন্ন স্টলে প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্ট উদ্ভাবনী পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়, যা উপস্থিত খামারি ও দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ করে।
উল্লেখ্য, একই দিন উপজেলা পরিষদ চত্বরে “নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হই, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি উৎসব–২০২৫।
অনুষ্ঠান শেষে ডা. শায়লা শারমিন প্রাণিসম্পদ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও পরিবর্তন জনগণের সামনে তুলে ধরতে সহযোগিতাকারী সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।





























