
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার ভাঙনে বাড়িঘর, জমিজমা, রাস্তাঘাট এমনকি মসজিদ-মন্দিরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে নদীর সঙ্গে লড়াই করে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে এক সময়ের সচ্ছল পরিবারগুলো। কেউ নয়বার, কেউ চারবার, কেউবা প্রত্যেক মৌসুমেই নতুন করে ঘর বাঁধে। তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে বিপর্যস্ত গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলগুলো।
তিস্তা নদী নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র ঘোষণা দিলেও এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয়দের ক্ষোভ চরমে। নদী ভাঙনের শিকার মানুষের জীবনের গল্প যেন এক করুণ বাস্তবতার চিত্রপট। নদী বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আন্দোলনকারী ও সচেতন নাগরিকরা মনে করেনÑ দীর্ঘদিনের অবহেলা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন বারবার বিলম্বিত হচ্ছে।
রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে চর শংকরদহের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সি মো. হারুন তার জীবনের অতীত-বর্তমান তুলে ধরে বলেন, ‘নদী ভাঙা দেখি বড় হইছি। জেবনে (জীবনে) নয়বা র বাড়ি ভাঙছি। মোর বাপ বাড়ি ভাঙছে চাইরব্যার। নদী ভাঙতে ভাঙতে নিঃস্ব হয়া গেছি। যেটে হামার বাড়ি ছিল, তিস্তার পানি শুকাইলে সেটে আবাদ করি খাই। কত জমি-জমা, বড় উঠানোত গাই-বাছুর, গোলাত ধান, পুকুর ছিল। এ্যালা কিছুই নাই। নদী সউগ কিছু নিয়া গেইছে। এ্যালা হাতে করি প্যাটে খাওয়া নাগে। সম্পদ বলতে কিছুই নাই আর।’
একই এলাকার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘শংকরদহের চাইর-পাঁচটা গেরাম ভাঙি গেইছে। ইচলীর চর, শংকরদহ, বাগেরহাট সব নিলাম হয়া গেইছে। হামার দিকে কোনোদিন সরকার চোখ তুলি তাকায় না। হামরা কাকে কমো। সেতুক রক্ষা করবে, সেই বান্দও ভাঙি গেইছে। এ্যালা ফসলের সিজেন। বান্দ ভাঙি যাওয়ার জন্তে ধানের জমিগুলাও ভাঙি যাইতোছে।’
কৃষক আলী উদ্দিন বলেন, ‘বিনবিনার চর থ্যাকি লক্ষ্মীটারীর ১ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত হামরা একটা বান্দ চাইতোছি সরকারের কাছে। আইজ পর্যন্ত সেই বান্দ পাই নাই। সরকার কয় তিস্তা প্রজেক্ট করবে, কিন্তু কই। হামার সউগ কিছু শ্যাষ হয়া গেইলে তিস্তা প্রজেক্ট হইবে নাকি?’
স্থানীয়রা জানান, গত এক দশকে লক্ষ্মীটারীর ৫টি ওয়ার্ড মারাত্মকভাবে ভাঙনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বর ওয়ার্ডের টাউরাসের বাজার ও শংকরদহের আংশিকসহ ২ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ইচলী, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাগেরহাট কেল্লারপাড়, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জয়রাম ওঝার আংশিক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চর ইশোরকুল নামাটারী গ্রাম নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের একাধিক মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক বিদ্যালয়, যোগাযোগের সড়কও ভেঙে চলে গেছে নদীতে। চলতি বছর আগস্টে উজানের ঢলে ১২১ কোটি টাকার তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষায় নির্মিত বাঁধে ভাঙন শুরু হয়। মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাঁধের প্রায় ৭০ মিটার অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
নদীকর্মীরা বলছেন, তিস্তার প্রতি অবহেলার কারণে দিন দিন বাড়ছে নদী শাসনের চ্যালেঞ্জ। তিস্তা নদীবেষ্টিত রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলায় প্রতি বছর নদী ভাঙনে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি, নদীর তীরবর্তী অধিবাসীরা সর্বস্ব হারিয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টুচক্রে পড়া এবং ক্রমান্বয়ে নদী শাসনের চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ১৭৪ বর্গকিলোমিটার জমি উদ্ধার হবে। যার আর্থিক মূল্য ১৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। প্রতি বছর রক্ষা পাবে ১১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার সম্পদ।
গঙ্গাচড়া লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, রংপুরের মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলা ও আমার ইউনিয়ন তিস্তা নদীর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এ রকম ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্তি পেতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিকল্প নাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই হবে।
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, এ বছর তিস্তায় বন্যায় হয়নি, কিন্তু সম্প্রতি তিস্তার পানি একটু বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ ভাঙনে তিস্তা দ্বিতীয় সড়ক সেতু আজ হুমকির মুখে। এই সরকার জানুয়ারি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও আমরা সেই আশ্বাসের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না। সরকার বলেছে প্রথম ধাপে কাজের জন্য চীন ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ও সরকার ২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা দেবে। জানুয়ারি মাসে নির্বাচনকালীন সরকার থাকবে। তখন সরকারের পক্ষে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করা সম্ভব নাও হতে পারে। যেহেতু সরকার ২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা দিতে চেয়েছে, তাই দ্রুত তা একনেকে পাস করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করে দেওয়া হোক।
রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, আমরা চাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বে যা কিছুর আয়োজন সম্পন্ন করতে হয়, সরকার নিশ্চই তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করবে।





























