
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি ফার্মেসিতে দোকানির সঙ্গে বািবতণ্ডায় জড়িয়েছেন জামাল হোসেন। বািবতণ্ডার কারণ জানতে এ প্রতিবেদক কথা বলেন জামাল হোসেনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহেও চার প্রকারের একই পরিমাণ ওষুধ কিনেছি এক হাজার ৪০ টাকা দিয়ে। এখন একই ওষুধ এক হাজার ২২০ টাকা চাইছেন দোকানি। সবকিছুর দাম এভাবে বাড়তে থাকলে আমরা ওষুধ না খেয়েই মরতে হবে। জামাল হোসেনের কথা থামিয়ে ফার্মেসি দোকানি বললেন, ওষুধের দাম কোম্পানি বাড়ায়। আমাদের কিনতে হয় বেশি দামে; বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে। এ অবস্থা শুধু জামাল হোসেনের নয়, ওষুধের লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত প্রায় সবারই এখন ত্রাহি অবস্থা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে যখন মানুষ দিশাহারা। ঠিক তখনই দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলো দাম বৃদ্ধির নীরব প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে।
রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার ওষুধের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সর্দি কাশি জ্বরের ক্যাপসুল ও সিরাপ, গ্যাস্ট্রিক, হূদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস রোগীর ইনসুলিন এবং অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে গেছে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। গত মাসের শেষদিকে গ্যাস্ট্রিকের যে ক্যাপসুলের পাতা ১৫০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। গ্যাস্ট্রিকের প্রোগ্যাভি ২০০ এমএল সিরাপ ২৫০ থেকে বেড়ে ৩০০ টাকা হয়েছে। টার্বোক্লাভ ৫০০ এমজি প্লাস ১২৫ এমজি প্রতি পিস ক্যাপসুল ৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা। এক পাতার চারটির দাম ২০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪০ টাকা। হূদরোগের জন্য ব্যবহূত রসুটিন ১০ মিলিগ্রামের এক পাতার ১৫টির দাম ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা। অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল অপটিমক্স ৪০০ মিগ্রা ট্যাবলেট এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় দাম বেড়েছে। গত জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে এক বক্স বিক্রি হয়েছে ৬৩৩ টাকা ৬৪ পয়সায়। পরে তা বেড়ে ৭০০ টাকা হয়। মুখের ক্ষতের সমস্যার জন্য এরোডিন সল্যুশন এক লিটারের বোতল ৭০৪ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। এমন প্রায় প্রয়োজনীয় ১৫ থেকে ২০টি ওষুধের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের ৭৪ শতাংশই রোগী নিজস্ব উৎস থেকে মেটায়। আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার হিসেবে পরিচিত এ ব্যয়ের বৈশ্বিক গড় মাত্র ৩২ শতাংশ। আবার চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই ওষুধে ব্যয় করছে বাংলাদেশের মানুষ। মৌসুমি রোগের চিকিৎসায় মানুষের যে ব্যয়, তার ৬৩ শতাংশই চলে যায় শুধু ওষুধ কিনতে। দেশে একজন মানুষের মোট চিকিৎসা খরচ যত হয়, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে ওষুধ কেনার পেছনে। এমতাবস্থায় ওষুধের দাম কমানোর বিপরীতে বারবার দাম বৃদ্ধি মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও জটিল করছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে প্রায় দেড় হাজারের বেশি কোম্পানি ২৭ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় রয়েছে ২১৯টি। তার মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। অন্য সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ওষুধের দামের বিষয়ে বলেন, ওষুধের দাম বৃদ্ধি বা কমানোর বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওষুধের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু এরই মাঝে ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়িয়েই চলছে।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে এ প্রতিবেদক কথা বলেন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওষুধের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধাীন। তবে ডলার সংকট, জ্বালানি সংকট, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে ওষুধের দাম বৃদ্ধি ছাড়া কোম্পানিগুলোর কোনো উপায় থাকে না।
দফায় দফায় ওষুধের দাম বৃদ্ধি জনসাধারণের ওপর প্রভাব সম্পর্কে জানতে এ প্রতিবেদক কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওষুধের কোনো বিকল্প পণ্য নেই। মানুষের জীবন রক্ষা করতে হলে ওষুধ খেতেই হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে ওষুধের দাম বৃদ্ধি মানুষের কষ্ট আরও বাড়াচ্ছে। ওষুধ জীবনরক্ষকারী পণ্য। অযাচিতভাবে ওষুধের দাম বৃদ্ধি করা উচিত নয়। নির্দিষ্ট নীতিমালা করে ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি।







































