
তারেক আল মুনতাছির:
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন হলো পিঠা। শীতকাল এলে গ্রামের পুকুরপাড়ে কুয়াশা মোড়া সকালে কিংবা চাঁদনি রাতে মাটির চুলায় পিঠা তৈরি করার যে আনন্দময় দৃশ্য দেখা যায় তা এ দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। এই ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে পরিচিত করার উদ্দেশ্যে সমুদ্র কন্যা কক্সবাজারের মতো সুন্দর পরিবেশে অবস্থিত কক্সবাজার সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় এক বর্ণাঢ্য পিঠা উৎসব।
পিঠা উৎসবের আয়োজক ছিল কলেজের সাংস্কৃতিক ক্লাব। এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। উৎসবের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, “তারুণ্যের হাত ধরে ঐতিহ্যের পথে”।
উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় প্রায় এক সপ্তাহ আগে। কলেজ অধ্যক্ষের নোটিশের মাধ্যমে প্রতিটি ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীরা দল গঠন করে নিজেদের স্টল তৈরি করে। কেউ পিঠা তৈরির উপকরণ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল, কেউবা স্টল সাজানোর কাজে। পিঠার নাম থেকে শুরু করে উপস্থাপনার ধরণ সব কিছুতেই ছিল তাদের সৃজনশীলতার ছাপ লক্ষ করার মতোই।
দুই দিনব্যাপী পিঠা উৎসবটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিনে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কলেজ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সুলাইমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানগণও উপস্থিত ছিলেন যা উৎসবকে আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। উৎসবের ২য় দিন কলেজ প্রাঙ্গণে সাজানো হয়েছিল গ্রামীণ আবহে। প্রতিটি স্টল ছিল বাঁশ, কাঠ, রঙিন কাপড় আর দেশীয় উপকরণ দিয়ে সাজানো। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই স্টলগুলো নকশা করে সেগুলোকে অনন্য করে তুলেছিল। প্রতিটি স্টলে ছিল দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পিঠার প্রদর্শনী। ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা, দুধচিতই, নকশি পিঠা, পুলিপিঠা, চিতই, জামাই পিঠা, আইত্তিকা পিঠা, কাট্টলি পিঠা, বিন্নি পিঠা,চটপটি, ক্ষীরমোহনসহ বিভিন্ন ধরনের পিঠার স্বাদ পেয়ে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন। শুধু পিঠাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, জ্ঞান বিকাশের জন্য ছিল বই স্টল। সেখানে নানা ধরণের জীবনমুখী বইয়ের সমাহার ছিল। পাশাপাশি পিঠা খেতে খেতে ক্লান্ত হলে ফ্রিতে পানির ব্যবস্থাও ছিল। এবং সেটির জন্য আলাদা একটা স্টল বরাদ্দ ছিল। আরেকটি স্টল ছিল কাপড়ের সেখানে বিভিন্ন ধরনের কাপড় যেমন জর্জেট থ্রি-পিস, এমব্রয়ডারি থ্রি-পিস, হাতের কাজের থ্রি-পিসসহ হিজাব, স্কার্ফ ছিল। পিঠার স্বাদ, ঘ্রাণ আর পরিবেশনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের শৈল্পিক প্রতিভার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিল।
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল পিঠার নানান বাহার। প্রতিযোগিতার মানদণ্ড ছিল পিঠার স্বাদ, উপস্থাপনা এবং সৃজনশীলতার। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের স্যারেরা স্টল পরিদর্শন করেন এবং পিঠার প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান করেন। এই সময় বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মোহাম্মদ সরওয়ার আলমের সাথে দেখা। সম্প্রতি তার পদোন্নতি হওয়ায় স্যারকে হয়ত আর বেশি দিন পাবো না। স্যার চট্টগ্রাম কলেজ পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। স্যারের সাথে বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের সাইফুল, আছিয়া, তাহিয়া, ইমাম, বিলকিস, মৌমিতা, মুনতাছির, তাসনুভা, ঝুমাদের সাথে ফটোসেশন হয়। স্যার আমাদের অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেন।
উৎসব শুধু পিঠার স্বাদ গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে ছিল জমজমাট সাংস্কৃতিক আয়োজন। স্টলের পাশেই মাঠ। মাঠে চলছিলো বার্ষিক প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা আর পিঠা উৎসব জমে ক্ষীর। একদিকে প্রতিযোগিতা অন্যদিকে পিঠা উৎসব।
শিক্ষার্থীদের দলগত নাচ, গান, আবৃত্তি আর নাটক পরিবেশনার মাধ্যমে উৎসবের পরিবেশ আরও রঙিন হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের শেষে ছিল ঐতিহ্যবাহী সব খেলা, ১০০মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা, চাকতি নিক্ষেপ, উচ্চ লাফ, দীর্ঘ লাভ, সাইকেল রেসিং, বুদ্ধির খেলা (স্মৃতি প্রতিযোগিতা), যেমন খুশি তেমন সাজো ইত্যাদি যা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ জাগায়।
এই পিঠা উৎসব ছিল এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তা উদ্যাপনের সুযোগ পেয়েছে। এই আয়োজনে রঙিন শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে তাদের মধ্যে দলগত কাজের মনোভাব, সৃজনশীলতা আর ঐতিহ্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ্য নয় বরং এটি তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মনে করি।
পিঠা উৎসব ছিল তারুণ্যের শক্তি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের একটি অনন্য উদাহরণ। এই ধরনের আয়োজন কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং পুরো সমাজকে ঐতিহ্য রক্ষার প্রেরণা দিতে পারে। ভবিষ্যতে এমন আরও আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। পিঠা উৎসব তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আর বাঙালি সংস্কৃতির মহিমা একসঙ্গে তুলে ধরার এক দুর্দান্ত প্রয়াস সৃষ্টি করেছে কক্সবাজার সরকারি কলেজ।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কক্সবাজার সরকারি কলেজ, কক্সবাজার।






































