
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসার সামনে কোনো খোলা জায়গায় কিংবা রাস্তায় হরহামেশাই শিশুদের খেলাধুলা করতে দেখা যায়। এদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। প্রতিদিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাসার সামনে খেলা করছিল ৫ বছরের শিশু মারিয়া।
কিছুক্ষণ পরই শিশুটি সেখান থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল। আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও বাবা রাসেল মিয়া তার কন্যার কোনো খোঁজ পাননি।
পরে স্থানীয় তেজগাঁওয়ের বাবলি মসজিদে আসরের নামাজের পর মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, মারিয়া নামের ৫ বছরের একটি মেয়ে শিশু হারিয়ে গেছে। কেউ শিশুটির খোঁজ পেলে ওই মসজিদ অথবা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়। এ সংবাদ লেখার সময় পর্যন্ত (রাত ১০টা) শিশুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি প্রায়শই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মসজিদের মাইকে অথবা সড়কে কোনো শিশু হারিয়ে গেছে মর্মে শিশুটির শারীরিক গড়ন ও বর্ণের বর্ণনা দিয়ে মাইকিং করতে শোনা যায়।
অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ‘হারিয়ে যাওয়া’ শিশুদের কোনো সন্ধান মিলে না। কোনো কোনোটির সন্ধান মিললেও দেখা যায়, শিশুটি অপহৃত হয়েছে। তার মা-বাবার কাছে মুক্তিপণও চাওয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অনেক অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করে এবং অপহরণকারীকেও গ্রেপ্তার করে।
সাম্প্রতিককালে একের পর এক শিশু অপহরণের ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাইমারি ও হাইস্কুল এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
সাধারণত অবুঝ শিশুদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করা হয়। সম্প্রতি রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে আড়াই বছর বয়সি এক শিশুকে অপহরণ করে কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় নিয়ে বিক্রি করে দেয় একটি চক্র। এ নিয়ে শিশুটির বাবা গত ২১ মার্চ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর শিশুটি উদ্ধারের জন্য মাঠে নামে ডিবি রমনা বিভাগের ধানমন্ডি জোনাল টিম। তদন্তে নেমে ওই শিশুটি অপহরণের ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীর একটি অপহরণ চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির ধানমন্ডি জোনাল টিম। তারা হলেন অপহরণকারী সুলতানা আক্তার ওরফে নেহা (২২), তার স্বামী সাইফুল ইসলাম (২৭) ও শিশুটির ক্রেতা মো. শাহজাহান (৩৪)। গত বুধবার কুমিল্লার লালমাই ও বরুড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় শিশু তাওসীনকে।
এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান রাজধানীতে শিশু অপহরণ বেড়েছে। বোরকা পরে পরিচয় গোপন রেখে শিশু চুরি করা হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, পেশায় রিকশাচালক নুরুল ইসলাম দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে হাজারীবাগের নিউ মডেল টাউন এলাকায় বসবাস করেন। গত ২১ মার্চ বিকেলে বাসার সামনে তার ৬ বছর বয়সি মেয়ে তাবাসসুম ও ছেলে তাহসীন খেলেতে যায়। এ সময় শিশুদের নানি লুৎফুন নাহার তাদের সঙ্গে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর একজন বোরখা পরা অজ্ঞাতনামা নারী লুৎফুন নাহারকে জিজ্ঞাসা করেন এরা অপনার কী হয়? পরিচয় জেনে সেখান থেকে চলে যায় ওই নারী। এর কিছু সময় পর শিশুদের খেলায় রেখে নানি বাসায় চলে যান। এই সুযোগে ওই নারী আবারও এসে শিশুদের ইশারায় ডেকে নিয়ে দুজনকে চিপস দেন। চিপস নিয়ে তাবাসসুম বাসায় ফিরে গেলেও শিশু তাহসীন নিজের কাছে রেখে দেন ওই নারী। একপর্যায়ে ওই নারী তাহসীনকে কোলে নিয়ে ঝাউচর রোডের দিকে চলে যায়।
ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির ছায়া তদন্তে নেমে অপহরণ চক্রটিকে শনাক্ত করেন ডিবির রমনা বিভাগের ধানমন্ডি জোনাল টিমের সদস্যরা। পরে গত বুধবার কুমিল্লার লালমাইয়ে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার শাহজাহানের বাড়ি থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। একই দিনে বরুড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী নেহা ও সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি প্রধান বলেন, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিঃসন্তান দম্পতির কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে চাহিদামতো শিশু চুরি করে বিক্রি করতেন। অপহরণের কাজটি করতেন গ্রেপ্তার সাইফুলের স্ত্রী নেহা। তিনি বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের টার্গেট করতেন। এরপর কৌশলে শিশুদের চকলেট, চিপসসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে কোলে করে নিয়ে সটকে পড়তেন। ভুক্তভোগী শিশু তাহসীনকে তারা অপহরণ করে কুমিল্লার শাহজাহানের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন।
যাদের সন্তান নেই বা হয় না, তাদের উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা প্রধান বলেন, ‘আপনারা সঠিক পদ্ধতিতে শিশু দত্তক নিন। কারও কোলের শিশু চুরি করে বা অপহরণ করে নিয়ে আপনাদের কাছে দিল আর আপনারা শিশুটিকে রাখলেন এটা অপরাধ। এমন অপরাধে আপনারাও একই মামলার আসামি হবেন। পাশাপাশি সন্তানদের বাবা-মাকে বলব, আপনার বাচ্চা বাসার বাইরে গেলে তাদের সঙ্গে পরিবারের বড় সদস্যরা থাকবেন। না হলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।’
এর আগেও এমনই বিভিন্ন চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ছাড়াও এর আশপাশের এলাকায়ও বেড়েছে শিশু অপহরণের ঘটনা। সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি চক্র ৫ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুদের টার্গেট করে অপহরণ করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব অপহৃত শিশির পাচারের শিকার হয়।
গত বছরের আগস্ট মাসে এক প্রতিবেদনে ইউনিসেফ বলছে, প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০০ নারী ও শিশু বিদেশে পাচার হচ্ছে। ইউনিসেফ বলছে, গত ১০ বছরে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সি অন্তত ৩ লাখ মানুষ শুধু ভারতেই পাচার হয়েছে। পাচারকৃতদের বাধ্য করা হয় দেহ ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তি বা শিশুশ্রমে।
এ বছরের ৩১ জানুয়ারি প্রকাশিত মতামত কলামে ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম লিখেছেন, পাচার একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত অপরাধ। প্রতিবছর অনেক নারী ও শিশু পাচারের শিকার হয়। কতজন মানুষ পাচার হয়, তা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। কারণ পাচার গোপনে সংঘটিত হয়। পাচারকৃত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক পরিসংখ্যান রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ পাচার হয়ে থাকে।







































