
বিদায়ি ২০২৫ সালে রাজশাহীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক বিভীষিকাময় চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক বছরে জেলায় অন্তত ১৭১ জন নারী ও শিশু নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ঘাতকের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন, আর লোকচক্ষুর অন্তরালে যাওয়া অভিমানে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন ২৮ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন শিশুসহ ৩৫ জন।
মানবাধিকার সংস্থা লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোসাল ওয়েলফেয়ার (লফস)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এই আঁতকে ওঠার মতো তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটি বলছে, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
এক নজরে ২০২৫ সালের চালচিত্র
লফস-এর ডকুমেন্টেশন সেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১২ মাসে নির্যাতনের শিকার ১৭১ জনের মধ্যে ১২০ জনই নারী এবং ৫১ জন শিশু।
- ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা: ৩২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ জনই শিশু। এছাড়া গণধর্ষণের শিকার ৩ জন এবং ধর্ষণের পর একজনকে হত্যা করা হয়েছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১০ জন।
- মৃত্যু ও আত্মহত্যা: বছরজুড়ে ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ২৮ জন। এছাড়াও হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে ৫ জনের ওপর।
- অন্যান্য অপরাধ: ৪৪ জন নারী-শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অপহরণ করা হয়েছে ৫ জনকে এবং নিখোঁজ রয়েছে ১০ জন। বলাৎকারের শিকার হয়েছে ২ শিশু।
বছরজুড়ে বেশ কিছু পৈশাচিক ঘটনা রাজশাহীর মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। পবায় অভাবের তাড়নায় নিজ হাতে দুই সন্তান মাহিম ও মিথিলাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন গর্ভধারিণী পিতা। বাঘায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে মুন্নি নামের এক গৃহবধূকে শরীরে ডিজেল ঢেলে পুড়িয়ে মারে তার স্বামী। পুঠিয়ায় ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সূর্য বেগমকে ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধও ঘটেছে। এছাড়াও নগরীর একটি ক্লিনিকে ডাক্তার কর্তৃক নার্স ধর্ষণ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খোদ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ শিক্ষাঙ্গন ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লফস-এর নির্বাহী পরিচালক শাহানাজ পারভীন লাকী বলেন, "যৌতুক ও পরকীয়া এই অঞ্চলের নির্যাতনের প্রধান অনুঘটক। বিদেশি টিভি সিরিয়ালের প্রভাবে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের মতো নতুন আপদ যুক্ত হয়েছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই আজ অপরাধের কৌশল পাল্টেছে।"
তিনি আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
লফস-এর পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে, শুধুমাত্র আইনের প্রয়োগে এই ব্যাধি সারবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করতে হবে। একইসঙ্গে নির্যাতনকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার ডাক দিয়েছে সংগঠনটি।





























