
ইয়ার রহমান আনান, কক্সবাজার
কক্সবাজারের রামুতে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের একশ্রেণির নেতাকর্মী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় জমি দখল, ইয়াবা লুট, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে অধ্যক্ষকে হুমকি- এসব মিলিয়ে এই জনপদে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে একের পর এক নেতাকর্মী গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছেন।
গত এক সপ্তাহেই এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় ৫ জন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে দলটি। এর মধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন ৩ নেতা, স্থগিত হয়েছে ৩ জনের পদ। পদত্যাগ করেছেন ছাত্রদলের উপজেলা আহ্বায়কও। শোকজ করা হয়েছে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ ভুট্টোকে। তবুও নিয়ন্ত্রণে আসছে না নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য, উল্টো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নানা অপকর্মে জড়িয়ে একের পর এক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে আমাদের মতো ত্যাগী নেতাকর্মীদের বারবার বিব্রত করছে। দল ও রাজনীতির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ডে।
ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফুরকান উল্লাহকে বহিষ্কার করা হয়েছে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অসদাচরণ এবং দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে।
রবিবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় রামু উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল বশর বাবু তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বহিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোক্তার আহমদ ও সদস্য সচিব আবুল বশর বাবুর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ফুরকান উল্লাহকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ বিএনপির সব পর্যায়ের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ফুরকান উল্লাহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ রামু সরকারি কলেজে অধ্যক্ষকে হুমকির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানা গেছে, গত ২৪ জুন বিকেল ৪টার দিকে রামু সরকারি কলেজে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীর নিয়ে উত্তেজনার সূত্র ধরে কলেজে এসে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হাছানুল ইসলামের কক্ষে প্রবেশ করেন ফুরকান উল্লাহ।
অধ্যক্ষ জানান, প্রথমে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়, এরপর সরাসরি এসে তিনি বলেন, 'আপনি কি প্রিন্সিপালগিরি করতে আসছেন, নাকি গুন্ডামি?' এরপর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক মোবারক হোসেন বলেন, ফোনে হুমকি দিয়ে ফুরকান উল্লাহ কিছুক্ষণের মধ্যেই কলেজে চলে আসেন। অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে তিনি চিৎকার করে গালিগালাজ শুরু করেন এবং অধ্যক্ষকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
সিনিয়র শিক্ষক শহীদুল হক কাজল জানান, তখন একটি জরুরি এইচএসসি পরীক্ষা কমিটির মিটিং চলছিল। সবার সামনেই অধ্যক্ষকে উদ্দেশ্য করে 'গুন্ডা' বলেন। এমন আচরণে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই।
তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই ডিএমপির পল্টন থানা এবং ২০১৮ সালের ২২ এপ্রিল মতিঝিল থানা পুলিশের হাতে ইয়াবাসহ আটক হন। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা (নং ৩৫/১৭৪ ও ৩৮/৩০৭) এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের এক বিএনপি কর্মী বলেন, ফুরকান উল্লাহর মতো একজন বিতর্কিত ব্যক্তি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় আমরা অনেক আগেই বিব্রত ছিলাম। এখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় স্বস্তি পাচ্ছি।
এদিকে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাজাহানের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইছেন এবং নির্বাচনের দিন 'নৌকা'র কার্ড ঝুলিয়ে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপির পদ নেওয়ার পর শাহাজাহান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন মানুষের জমি দখল করেছেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। যদিও ৫ আগস্টের আগে তাঁর বিএনপির সঙ্গে কোনো কার্যকর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি।
এর আগে রামুতে ইয়াবা লুটের ঘটনায় বিএনপি, যুবদল ও শ্রমিক দলের আরও তিন নেতার পদ স্থগিত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজারকুল ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. নুরুল কবির, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দানু মিয়া এবং শ্রমিক দলের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া রামু উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নিজেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
রাজারকুল ইউনিয়নের এক যুবদল নেতা বলেন, একজন নেতা যখন দলীয় শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিস্বার্থে সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়, তখন আমাদের মতো ত্যাগীর কষ্টকর হয়ে পড়ে।
রামু উপজেলা বিএনপির এক প্রবীণ নেতা বলেন, দলীয় পদ পেতে টাকা খরচ, তারপর জমি দখল আর অস্ত্রের ভয়- এই রাজনীতি আমরা করিনি। এরা দলের ভাবমূর্তি পুরো নষ্ট করছে।
তিনি আরও বলেন, ভোটের সময় 'নৌকা'র পক্ষে কাজ করে আবার বিএনপির পদভারে নেতৃত্ব দেওয়া- এটা আমাদের রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা হতবাক ও বিব্রত।
রামু সরকারি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বেো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দাপট বরদাশত করা যায় না। একজন অধ্যক্ষকে অপমান মানে গোটা শিক্ষাঙ্গনের মর্যাদাকে লাঞ্ছিত করেছে।
রামু থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে এমন আচরণ আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কলেজ কর্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হাছানুল ইসলাম বলেন, কলেজে যোগদানের পর থেকেই নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জোর দিয়েছি। এমন ঘটনায় আমি মর্মাহত।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহম





























