
একটা সময়ের রূপগঞ্জ উপজেলা ছিল ধূলিধুসর, নিরস আর নিস্তরঙ্গ। সেবাগ্রহীতারা আসতেন, কাজ সেরে চলে যেতেন, মন ছুঁয়ে যেত কিছুই না। অথচ আজ, উপজেলার দিকে চোখ রাখলেই দেখা যায় এক টুকরো ‘সবুজ স্বর্গ’। যেন ইট-কাঠ-পাথরের প্রশাসনিক ভবনটি প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে বলেছে, “আমাকেও রাঙাও, রাঙাও সবুজে।”
উপজেলার পাঁচতলা ভবন ও তার আশপাশে চোখ রাখলেই মন কেমন করা সবুজের ঢেউ। ভবনের প্রতিটি বারান্দা, করিডোর, খোলা মাঠ, এমনকি অফিসঘরের জানালার পাশে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। প্রতিটি দপ্তরের আঙিনায় যেন সবুজ একজোট হয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, “এখানে প্রাণ আছে, এখানে প্রশান্তি আছে।”
এই পরিবেশ কেবল চাক্ষুষ নয়, মানসিক এক প্রশান্তির ছোঁয়াও বটে। সেবা নিতে আসা মানুষগুলো বসে পড়ে বারান্দায়। কেউ বই হাতে, কেউ নিঃশব্দ দৃষ্টিতে গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ বা গল্প জুড়ে দেন পাশের আগন্তুকের সঙ্গে। আর তার জন্য আলাদা করে জায়গাও আছে—উপজেলা চত্বরে প্রায় দুই হাজার বই নিয়ে একটি ছিমছাম লাইব্রেরি। যেখানে পড়া হয়, গল্প হয়, মানুষটাও হয় কিছুটা বদলে যাওয়া।
এই বদলের নেপথ্যে আছেন এক ব্যতিক্রমী প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম। যিনি শুধু গাছ লাগাননি, লাগিয়েছেন মানুষের মনের ভেতরেও এক সবুজ স্বপ্ন।
তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছি অফিস হোক প্রাণবন্ত, যেন মানুষ এখানে এলে দম নিতে পারে, সুন্দর অনুভব করে। পরিবেশের এই পরিবর্তন শুধু চোখের আরাম নয়, মনেরও খোরাক। আবহাওয়ার এই উষ্ণতায় একমাত্র সবুজায়নই পারে শান্তির আশ্রয় দিতে।”
সেবাগ্রহীতা রায়হানা সুলতানা কনা এসে যেন এক নতুন অনুভবের কথাই জানালেন:
“আগে যখন আসতাম কেমন যেন মরা-মরা লাগতো। আজ রোববার আসার পর মনে হলো, যেন এক নতুন উপজেলায় এসেছি। সবুজে মন ভরে গেল।”
দাউদপুর থেকে আসা হালিম মিয়া বলেন, “উপজেলাতে গেলে এখন নয়ন জুড়িয়ে যায়। আগে এমনটা ছিল না। এখন সব দপ্তর, বারান্দা সব জায়গায় গাছ আর গাছ। পরিবেশটাই বদলে গেছে।”
উপজেলার নির্বাচন অফিসার তাজ্জালী ইসলাম তৃষা বলেন, “সবুজ ঘেরা উপজেলার সাথে এক ধরনের ভালোবাসা গড়ে উঠেছে। সত্যি বলতে কি, এখান থেকে আর বের হতে মন চায় না।”
এমন অনুভবের কথা বললেন প্রকল্প অফিসার আইমিন সুলতানাও। তাঁর মতে, “আগে এতো সুন্দর ছিল না। এখন প্রতিদিন কাজের পাশাপাশি প্রকৃতিকে উপভোগ করি।”
একজন সাবেক কর্মকর্তা, বর্তমানে পুনরায় যোগদানকারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বললেন, “এর আগে আমি এখানে ছিলাম। তখন একেবারেই প্রাণহীন জায়গা ছিল। এবার এসে দেখি এক সবুজ অরণ্য। কাজ করতেও ভালো লাগে।”
ইউপি সদস্য মাসুম আহম্মেদের ভাষায়, “একটা উপজেলার প্রাণকেন্দ্র যদি এভাবে সবুজায়ন হয়, তাহলে মানুষ সেই জায়গাকে আপন মনে করে। মন খারাপ নিয়েও কেউ যদি আসে, সবুজ দেখে বদলে যায় তার ভাবনাগুলো।”
রূপগঞ্জের এই রূপান্তর যেন এক নিঃশব্দ আন্দোলন। এটি শুধুমাত্র গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নয়, এটি একটি দর্শন, যা বলে: সরকারি অফিসও হতে পারে শান্তির স্থান, হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার উপলক্ষ।
এই সবুজায়ন আজ রূপগঞ্জের সীমা ছাড়িয়ে অন্য উপজেলার জন্য হয়ে উঠতে পারে অনুকরণীয় উদাহরণ। কারণ প্রকৃতি যেদিকে হাসে, মানুষও সেদিকেই এগোয়।





























