
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন :
ঢাকার সাভারে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি ও হামলায় সরাসরি জড়িত থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ পাভেল ওরফে তোতলা পাভেলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (১১ জানুয়ারি) দুপুর ১ টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল ও চীনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশী ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় পাভেলকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে ঢাকা জেলা পুলিশ।
চীনের বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাভেল বাংলাদেশে ফিরছে-ইন্টারপোলের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়ে ঢাকা জেলা পুলিশের নির্দেশনায় সাভার মডেল থানা পুলিশ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থান নেয়। সোমবার দুপুরে উড়োজাহাজে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পরই বাংলাদেশী ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার বিকেলে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, 'পাভেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার পুকুরপাড় গ্রামের হেফজু মিয়ার ছেলে ও নিষিদ্ধ সংগঠন সাভার পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পতিত উপজেলা চেয়ারম্যান শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গডফাদার মঞ্জুরুল আলম রাজীবের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। পাভেল ক্যাডার হিসেবে বিভিন্ন মানবতা বিরোধী অপরাধ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজীবের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পরিচিত কারাগারে থাকা জাকির হোসেন ওরফে মামা জাকির ওরফে টেপা জাকিরের সঙ্গে একত্র হয়ে রাজীবের বিছানায় বিকৃত রুচির নোংরা যৌনতার সম্পর্ক স্থাপন করতেন।'
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার একদফা আন্দোলন চলাকালীন সময় মনজুরুল আলম রাজীবের সঙ্গে সাভারে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে
হামলা ও গুলিবর্ষণে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তোতলা পাভেল। ঘটনার পর থেকে দীর্ঘদিন তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পাসপোর্ট এর নাম পরিবর্তন করে পাভেল ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ শেষে সর্বশেষ চীনে অবস্থান করছিলেন। সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে করে পাভেল চীন থেকে জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ভারত হয়ে পর্তুগাল ঘুরে আমেরিকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিলেন।
এর আগে, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থা মার্কেটে দোকান দখল, চাঁদা দাবি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ওপর হামলার ঘটনায়, সাভার পৌরসভার আনন্দপুর সিটিলেন এলাকার ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী চুন্নুর প্রতিষ্ঠানে গুলি করে আতঙ্ক ছড়িয়ে ১০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায়, ইন্টারনেট ব্যবসায়ী রকিকে অপহরণ ও ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপন আদায়ের ঘটনায় এবং দৈনিক মানবজমিনের সাংবাদিক ও সাভার উপজেলা সাংবাদিক সমিতির আহবায়ক সোহেল রানাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে অন্তত ৪ বার হাজত বাস করেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজীবের প্রভাবে আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পাভেল।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আতঙ্কের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর গ্রেপ্তারে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত ছাত্রদের স্বজন ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তারা পাভেলের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এবিষয়ে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী বলেন, “মোহাম্মদ পাভেল সাভারে সংঘটিত ছাত্র হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল। এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তিনি সাভার মডেল থানায় দায়ের হওয়া ৫টি হত্যা মামলাসহ ১৩ মামলার এজাহারনামীয় আসামি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন করে মঙ্গলবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।”
প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসসহ ৪ ও ৫ আগস্ট সাভারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে ছাত্র-জনতা জমায়েত হলে তৎকালীন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী পতিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব এবং ঢাকা-১৯ আসনের পতিত সংসদ সদস্য ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।
এতে সাভার-আশুলিয়ায় শতাধিক ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং অসংখ্য মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন।





























