
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে জীবন নির্বাহ করা ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সঞ্চয় করার মতো অবস্থা সাধারণ কোনো মানুষেরই নেই। ফলে নতুন করে মানুষের সঞ্চয় না বেড়ে কমছে অব্যাহতভাবে। তিন অর্থবছরের ব্যবধানে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে মোট জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে প্রায় আড়াই শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে মোট জাতীয় সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৩০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সেই হিসেবে তিন বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়ের হার কমেছে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া, ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে হয়েছিল ২৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এরপরের অর্থবছর অবশ্য সঞ্চয়ের হার কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ও কমেছে। সেই অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল জিডিপির ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে যা ছিল ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে সঞ্চয় কমেছে। এ ছাড়া, ২০২১-২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার কমে হয়েছিল ২৫ দশমিক ২২ শতাংশ। পরের অর্থবছর অবশ্য এই হার কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশে বিনিয়োগও কমছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৩১ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ, তিন অর্থবছরের ব্যবধানে দেশের জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার অনেকটাই স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩০.৯৫ শতাংশ। এর আগের দুই বছরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেটা আরও কমেছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার ছিল ৩২.০৫ শতাংশ। এ ছাড়া, আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া সরকারের ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮.৫১ শতাংশ। বিগত সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার হতে হবে ৩৬.৫৯ শতাংশ। যা অর্জন এখন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই অস্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাতিল করেছে। বিনিয়োগ এবং সঞ্চয় হ্রাসের ধারা দেখে বোঝা যায়, বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান হয়নি এবং মজুরিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে একই হারে বাড়েনি।
করোনার অভিঘাতে ২০২০ সালে অনেক মানুষের আয় কমে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরপরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। এ কারণে ২০২১-২২ অর্থবছর জুড়েই ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যা এখনো বহাল রয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না। মজুরি বৃদ্ধির হারও মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এ ছাড়া ব্যাংক আমানতের সুদহারও মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। মানুষের ভরসার জায়গা ছিল সঞ্চয়পত্র, কিন্তু তার সদুও দফায় দফায় কমানো হয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিক খাতে সঞ্চয় কমছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের হিসাব কারও কাছে নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে সরকার। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি। সুদের হার বাড়ানোর পরও বাড়ছে না সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। অর্থাৎ বর্তমানে মানুষের সঞ্চয় করার মতো অবস্থা নেই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা মহামারির পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে দেশের মানুষ। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এতে মানুষ সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। মানুষের জীবনযাপন আরও কঠিন হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তারা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া মূলত মানুষের সঞ্চয়ই বিনিয়োগের প্রধান উৎস। সে জন্য সঞ্চয় কমে গেলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ঘাটতি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, একসময় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বিনিয়োগের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু এখন সেটা কমে গেছে। তিনি মনে করেন, ২০২০-২১ সালে শুরু হওয়া করোনার প্রভাব ও ২০২২ সালের শুরু থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ শুরু হওয়ায় মানুষ নতুন করে সঞ্চয় করতে পারছে না। বরং আগে করা সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। ন্যূনতম ভোগব্যয় করতেই এখন মানুষ চাপে পড়ছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া মূলত মানুষের সঞ্চয়ই বিনিয়োগের প্রধান উৎস।’ সে জন্য সঞ্চয় কমে গেলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ঘাটতি হতে পারে। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের যে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটা যদি পূরণ না হয় তাহলে সরকারের বাজেট ঘাটতিও বেড়ে যাবে। এ জন্য বর্তমান সরকারকে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সঞ্চয়ের হার কমার অন্যতম কারণ আয় বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। আয় বৃদ্ধির হার কমলেও যদি ব্যয় বৃদ্ধির হার সেই তুলনায় না কমে তাহলে তো সঞ্চয়ের হার কমে যাবে। ব্যয় বৃদ্ধির হার না কমার অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। আর আয় বৃদ্ধির হার কমেছে কারণ প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার কমে গেছে। কর্মসংস্থানেও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সঞ্চয়ের হার যদি কমে যায়, তাহলে প্রবৃদ্ধি ধারণ করার সক্ষমতা কমে যাবে। সেই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যও দুর্বল হয়ে যায়। কারণ সঞ্চয় কমলে বাইরে থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে। জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে।’







































