
মোঃ রায়হান মাহামুদ,
গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে সবচেয়ে বড় মাছের মেলা। যা এলাকায় জামাই মেলা হিসেবেও পরিচিত। এ মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ। উপজেলার জামালপুর, মোক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের ত্রিমোহনায় অবস্থিত বিনিরাইল গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এ মাছের মেলা বাংলা সনের পৌষ মাসের শেষ বা মাঘ মাসের প্রথম দিন অনুষ্ঠিত হয়।
মেলার দিনটিকে ঘিরে এখানে দিনব্যাপী চলে আনন্দ-উৎসব। এ গ্রামসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মেয়েরা মেলা উপলক্ষে তাদের স্বামী সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ীতে বেড়াতে আসেন। এলাকার জামাইরা মেলার সবচেয়ে বড় মাছটি কিনে শ^শুর বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার যেমন চেষ্টা করেন তেমনি শ^শুররাও চেষ্টা করেন বড় মাছটি কিনে মেয়ে, জামাই ও নাতি নাতনীদের আপ্যায়ন করতে। বিনিরাইলের মাছের মেলা জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার এক নিরব প্রতিযোগীতার মাঠ হয়ে উঠে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারী) অনুষ্ঠিত এবারের মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রায় ৬ ফুট লম্বা ৯২ কেজি ওজনের পাখি মাছ। ৬০০ টাকা কেজি দরে যার দাম ৫৫ হাজার ২০০ টাকা হেঁকেছেন গাজীপুর চৌরাস্তার মা মৎস্য আড়তের মালিক সোহাগ শেখ। মেলায় তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ১০ লাখ টাকার মাছের পশরা সাজিয়ে বসেছেন। এছাড়া ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সায়েদ আলী সুপার মার্কেটের নাইম ফিশের মালিক নাইম মিয়া কাতলা, আইড় ও বোয়ালসহ নানা প্রজাতির প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছের পশরা নিয়ে বসেছেন। তার দোকানের একেকটি কাতলার ওজন ২৫ থেকে ৩০ কেজি। ঢাকার ডেমরা এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী সুমন ২০ কেজির কয়েকটি কাতলাসহ বাহারি প্রায় ৭ লাখ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন। এসব মৎস্য ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা বিনিরাইলের মাছের মেলায় ১৫ থেকে ২০ বছর যাবত মাছ বিক্রির জন্য আসছেন।
গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে আসা আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি ৩২ কেজির একটি কাতলা কিনেছেন। মেঘনা নদীর কাতলা মাছটি পার্শ্ববর্তী নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার খানেপুর বাজারের ব্যবসায়ী রঞ্জিত বর্মণের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় কেনেন।
মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা আসেন। ভারত, বারমাসহ দেশের নানা এলাকার সমুদ্র, নদী ও খামার থেকে পাখি, রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, আইড়, পানপাতা, রুপচাঁদা, কাইকা, বাইম, গলদা ও বাগদা চিংড়সহ নানান জাতের বড় বড় মাছ আসে। মাছের পাশাপাশি কাঠের তৈরি আসবাব, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, বাচ্চাদের খেলনা, হরেক রকম মিষ্টি, তিলা, কদমা, ফলমূল, কাঁচা তরকারি, খাবারের দোকানসহ নানান জিনিসপত্রের পশরা সাজান দোকানিরা। মেলায় বিনোদনের জন্য পাশের গ্রাম চুপাইর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিভিন্ন পণ্যের দোকানের পাশাপাশি নাগরদোলা, চরকি, বাচ্চাদের ছোট চলন্ত ট্রেন, নৌকা ও জাদুঘর ইত্যাদি তিনদিন পর্যন্ত অবস্থান করবে। একদিনের এ মেলায় এবার প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা বলেন, বৃটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। শুরুতে এ মেলা শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও বর্তমানে এটা সকল ধর্মের মানুষের কাছে ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে। মেলায় হাজার হাজার ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শণার্থীর আগমন ঘটে থাকে।
এই বছর মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন জানান, মেলাটি প্রায় আড়াই শত থেকে তিনশত বছর ধরে চলে আসছে। এই মেলা প্রতি বছর পৌষ মাস শেষে অনুষ্ঠিত হয়। তাই একে পৌষ সংক্রান্তির মেলা বলে। তবে মেলা উপলেক্ষে এলাকার জামাইরা শ্বশুড় বাড়িতে বেড়াতে এসে বড় বড় মাছ কিনে বিধায় একে জামাই মেলাও বলে। এই মেলায় মানুষ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেনার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে। মেলা উপলক্ষে এলাকার চার পাঁচ গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে মেহমানরা আসেন। এতে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।





























