
বেলাল উদ্দিন স্টাফ রিপোর্টার:চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানায় দায়ের করা একটি মাদক মামলাকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথিতে ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হলেও, আসামি ও মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল দায়ের হওয়া এ মামলার বাদী লোহাগাড়া থানার এসআই (নিরস্ত্র) মাঈন উদ্দিন। এজাহার অনুযায়ী, ওইদিন রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতি ইউনিয়নে বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এসময় কক্সবাজারমুখী একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল থামিয়ে চালক মোঃ মাকসুদ আলম সাগর (২৫)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে আসামি তার কাছে মাদক থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে মোটরসাইকেলের ইয়ার বক্সে বিশেষভাবে লুকানো ২০টি প্যাকেট থেকে মোট ৪ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত ইয়াবার ওজন ৩৮৫ গ্রাম বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।তবে এই বিবরণের সঙ্গে একমত নন আসামি নিজেই। ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার কাছে প্রকৃতপক্ষে ১২ হাজার পিস ইয়াবা ছিল। কিন্তু মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ৪ হাজার পিস। তার অভিযোগ, বাকি ৮ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।এদিকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মামলার ২ নম্বর সাক্ষী ছালামত করিম (২৫) জানান, তিনি একজন দিনমজুর। ঘটনার দিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাদের বহনকারী সিএনজি থামিয়ে তল্লাশি চালায়। তবে তাদের কাছ থেকে কোনো অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি।তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে পুলিশ তাদের মাদক মামলার সাক্ষী হতে বলে। রাজি না হলে মাদক মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে সাদা কাগজে নাম-ঠিকানা লিখে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী মোঃ আজাদ (২২)। তিনি বলেন, তল্লাশির সময় কিছু ব্যক্তি পুলিশের পোশাকে ছিলেন না এবং তাকে সাক্ষী হতে অস্বীকৃতি জানালে ইয়াবা ব্যবসার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তার মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।উভয় সাক্ষীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, তারা কেউই নিজ চোখে ইয়াবা উদ্ধার হতে দেখেননি। তাদের অভিযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাক্ষী বানানো হয়েছে।অন্যদিকে, মামলার বাদী এসআই মাঈন উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আসামিরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলে থাকে। আমরা মোটরসাইকেলের এয়ার ফিল্টার থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছি এবং সেটিই মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানের সময় ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল।তবে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন লোহাগাড়া থানার ওসি (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে স্বল্প সময় উপস্থিত ছিলেন এবং কোনো ভিডিও ধারণ করেননি। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, কাউকে জোরপূর্বক সাক্ষী করা আইনসম্মত নয় এবং এমন অভিযোগ সত্য হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি শুনে পরে মন্তব্য করার কথা জানান। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।এজাহার সূত্রে জানা যায়, বরিশালের বাসিন্দা মাকসুদ আলম সাগর কক্সবাজার থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বহন করছিলেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে।ঘটনাটি এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জব্দ তালিকায় গরমিল, সাক্ষ্যগ্রহণের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্টদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।




























