
দিন দিন তাপদাহ বাড়ছেই । গরম ও অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করছে সাধারণ মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ছয় জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকার পাশাপাশি আরও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়া পূর্বাভাসে আরও বলা হয়, সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বর্ধিত আবহাওয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময়ের শেষদিকে দিন ও রাতের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও গরমের তীব্রতা খুব একটা কমবে না।
তীব্র এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকদের কাজের বড় অংশই প্রখর রোদে খোলা আকাশের নিচে। ফলে প্রখর রোদ ও দহনজ্বালা তাদের জীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়।
অনেকেই বলছেন, দুপুরের দিকে রাস্তায় বা মাঠে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময় মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা ও দুর্বলতায় শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে দুপুরে কাজ বন্ধ রাখলেও তাতে আয় কমে যাওয়ার চাপ আরও বাড়ে। ফলে তীব্র এই তাপপ্রবাহ তাদের জীবনে শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, অর্থনৈতিক সংকটও ডেকে আনছে।
গরমের কারণে কাজের গতি কমে যাওয়ায় দৈনিক আয়ও কমে যাচ্ছে। রাজশাহীর রিকশাচালক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘রোদে বের হলেই মাথা ঘুরে। যাত্রী কম, আয়ও কমে গেছে। কিন্তু বের না হলে তো সংসার চলবে না। অন্যদিকে অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়—এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে দিশাহারা শ্রমজীবী মানুষ।’
চুয়াডাঙ্গার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, ‘ধান কাটার সময় এই গরমে মাঠে থাকা যায় না। রোদে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় মাথা ঘুরে। একটু পরপর পানি খেতে হচ্ছে। তারপরও শরীর ভালো থাকে না। এভাবে কাজ করলে শরীর টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
যশোরের ভ্যানচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘দুপুরের পর রাস্তায় মানুষই থাকে না। গরমে সবাই ঘরে ঢুকে যায়। ফলে আমাদের আয় অর্ধেক হয়ে গেছে। তারপরও জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামতে হচ্ছে।’
চিকিৎসকরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন ও নানা ধরনের গরমজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে হিটস্ট্রোকের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত পানি পান, ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
পাবনার এক গৃহিণী শিউলি খাতুন বলেন, ‘ঘরের ভেতরও যেন আগুনের মতো গরম। ফ্যান চালিয়েও আরাম নেই। বাচ্চারা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে। রাতেও ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। গরমে সবাই অস্থির হয়ে থাকে। সারাদিন বাচ্চাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জের এক স্কুলশিক্ষক জানান, ‘স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে। অভিভাবকরা গরমের কারণে অনেকেই সন্তানদের পাঠাচ্ছেন না। তীব্র গরমে ক্লাসরুমে ঠিকমতো পড়াশোনার পরিবেশও থাকে না। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ বোধ করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক স্কুলেই ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা বা বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।’
তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় লোডশেডিংয়ের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পানির চাহিদাও। অনেক জায়গায় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তীব্র গরমের পাশাপাশি পানির সংকট জনজীবনে বাড়তি দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
কুষ্টিয়ার বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘গরমে এমনিতেই থাকা যায় না, তার ওপর বিদ্যুৎ গেলে অবস্থা আরও খারাপ হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট বাচ্চা ও বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়তে হয়।’
আবহাওয়াবিদদের মতে, সামনে কয়েকদিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। যদিও কিছু এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন—অপ্রয়োজনে রোদে বের না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার।
তাপদাহের এই দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা—কবে নামবে বৃষ্টি, আর কবে মিলবে কিছুটা স্বস্তি।





































