
কৃষ্ণ দাস, বিশেষ প্রতিনিধি
ফেনী শহরের প্রবেশমুখ দাউদপুর ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বৃক্ষ—স্থানীয়দের কাছে পরিচিত “বড় কড়ই গাছ” বা “মেঘ শিরিষ” নামে। প্রায় চার শতাব্দী ধরে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি আজও এলাকার মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত, তবে এখন তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, গাছটি প্রায় ৪০০ বছর পুরোনো। কেউ বলেন, শের শাহের আমলে নির্মিত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সময়ই এই গাছ রোপণ করা হয়েছিল; আবার কেউ মনে করেন, ব্রিটিশ আমলের শুরুতে স্থানীয় জমিদাররা পথচারীদের বিশ্রামের জন্য এটি লাগিয়েছিলেন। সময়ের ব্যবধানে গাছটি হয়ে ওঠে দাউদপুরের অন্যতম ঐতিহ্য।
ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তথ্যমতে, গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম (Albizia saman), স্থানীয় নাম মেঘ শিরিষ। অনেকে একে “কড়ই গাছ”, “বিলাতি শিরিষ” বা “রেইন ট্রি কড়ই” নামেও চেনেন। গাছটির ইংরেজি নাম Rain Tree। এটি বাংলাদেশের দেশীয় উদ্ভিদ নয়—এর আদি নিবাস মেক্সিকো ও ব্রাজিল। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারত উপমহাদেশে এই গাছের আগমন ঘটে।
গাছটির নিচে একসময় বসে গল্পগুজব করতেন পথচারীরা। এখনো সন্ধ্যার পর দেখা যায়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা সেখানে বসে আড্ডা দেন, শিশুরা খেলে বেড়ায়, অনেক তরুণ-তরুণী থামে একটু বিশ্রাম নিতে।
স্থানীয়দের মতে, সন্ধ্যা নামলে গাছের নিচে শোনা যায় হাজারো পাখির কিচিরমিচির। বিশাল শাখা-প্রশাখা জুড়ে অসংখ্য পাখির বাসা রয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো গাছটি যেন জীবন্ত এক পাখির রাজ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছটির বয়স এখন চার শতকেরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক নিয়মে বেড়ে ওঠা এই ‘মেঘ শিরিষ’ এখন যেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়সজনিত কারণে এর কাণ্ডে ফাটল ধরেছে, অনেক ডালপালা শুকিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে একাধিকবার ঝড়ের আঘাতে গাছটির বিশাল ডালপালা ভেঙে পড়েছে। ফলে গাছটি তার আগের বিশাল রূপ হারিয়ে ক্রমে ছোট হয়ে আসছে।
শহরের প্রধান সড়কের পাশে অবস্থান হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলাবালিও এর প্রাণশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এত ইতিহাসসমৃদ্ধ এই গাছটি সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা স্থানীয় কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যত্নের অভাব ও অবহেলাই এখন এই প্রাচীন বৃক্ষের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেনী জেলা বন বিভাগের এক কর্মকর্তা এস এম কায়সার হামিদ বলেন, আমরা বিষয়টি জানি। গাছটি সুরক্ষার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।





























