
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিমফস্বল বা তৃণমূল পর্যায়ে সংবাদিকতা এখন এক গভীর সংকটে। এক সময় সাংবাদিকতাকে মহান পেশা হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমানে কার্ডধারী কিছু অশিক্ষিত ও ধান্ধাবাজ ব্যক্তির কারণে এই পেশার মান মর্যাদা তলানিতে ঠেকেছে। গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে প্রভাবশালী ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই যেন তাদের মূল লক্ষ্য।বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর এ বিষয়ে বলেন, 'শিক্ষাগত যোগ্যতার বালাই নেই, এমনকি নিজের নাম বা পত্রিকার নাম সঠিকভাবে লিখতে পারেন না এমন অনেকে এখন মফস্বলের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে করে দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠার সাথে কাজ করা প্রকৃত সাংবাদিকরা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এদের কারণে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।'হাতে দামী স্মার্টফোন, গলায় বড় অক্ষরে লেখা ‘সাংবাদিক’ আইডি কার্ড, আর চলাফেরায় রাজকীয় ভাব—দেখলে মনে হয় পেশাদার সাংবাদিক। কিন্তু বাস্তবে এদের অনেকেরই নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা সাংবাদিকতার ন্যূনতম ব্যাকরণ সম্পর্কে ধারণা। মফস্বলের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিস পর্যন্ত সর্বত্র এখন এসব তথাকথিত ‘হলুদ সাংবাদিকদের’ উপদ্রব বাড়ছে। তারা অনেক সময় সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে।এ বিষয়ে বাজিতপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বলেন, “সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই কোনো প্রশিক্ষণ বা ন্যূনতম জ্ঞান ছাড়াই শুধু আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এতে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”অভিযোগ রয়েছে, অনলাইন পোর্টাল বা নামসর্বস্ব কিছু পত্রিকার কার্ড সংগ্রহ করে এরা মূলত ধান্ধাবাজিতে লিপ্ত। গ্রামের কোনো জমি বিবাদ, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা সরকারি দপ্তরের ছোটখাটো অনিয়ম পেলেই হাজির হন এই বাহিনী। সমাধানের কথা বলে বা নিউজ করার ভয় দেখিয়ে শুরু হয় দেনদরবার। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও।"সাংবাদিকতা এখন যে কেউ চাইলেই করতে পারছে। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। এই অশিক্ষিত ও অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য রুখতে না পারলে প্রকৃত সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়বে।" মন্তব্য চ্যানেল এস কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম রাজনের।মফঃস্বলে সাংবাদিকতা নিয়ে কিশোরগঞ্জের তরুণ সাংবাদিক কালের কন্ঠ মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ছাইদুর রহমান নাঈম বলেন, "বর্তমানে সৃজনশীল সাংবাদিকতার চর্চার চেয়ে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সহজে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে এই পেশায় নব্য শৌখিন নামধারী সাংবাদিকদের আগমন ঘটেছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মানিত, দায়িত্বশীল এই পেশার মর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। কেউ সৃজনশীল সাংবাদিকতা শেখার আগ্রহ তেমন দেখাচ্ছে না। কপি-পোস্ট ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করে নিজেকে জাহির করাতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন অনেকে। ফলে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের আগাম দাসত্ব এবং পদলেহনকেই নিজের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে নিয়ে এগোতে চান অনেকেই। অনেকে ৫০০/১০০০ টাকার কার্ড কিনে এবং রাতারাতি ভুঁইফোড় একাধিক সংগঠন খুলে স্বঘোষিত পদ লাগিয়ে নিজেকে মহান সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে যেন সৌভাগ্যবান মনে করেন। এমন শ্রেণির কারণে পেশাদার ও মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বিব্রত হতে হচ্ছে। ভুঁইফোড়দের বিরুদ্ধে পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এ বিষয়ে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। ভালো-মন্দ চিনে সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে।"প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব চললেও আইনি জটিলতা বা ঝামেলার ভয়ে অনেকেই মুখ খোলেন না। তবে সচেতন মহলের দাবি, তথ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালা সঠিক প্রয়োগই পারে মফস্বল সাংবাদিকতাকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে।আরেক তরুণ সংবাদকর্মী মোফাসসেল সরকারের মন্তব্য, "মফস্বল সাংবাদিকতা বর্তমানে একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, বর্তমানে অনেক অল্প শিক্ষিত লোক মাত্র ১ থেকে ২ হাজার টাকার বিনিময়ে নামসর্বস্ব ও ভুঁইফোঁড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র (কার্ড) সংগ্রহ করছে। তারা সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও নানাবিধ ধান্ধাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছে, যা এই মহান পেশাটিকে কলুষিত করছে।" এদিকে মফস্বল সাংবাদিকদের নিয়ে সমাজে রয়েছে অনেক নেতিবাচক ধারণা। আর বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণার মূলে রয়েছে কিছু আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতা, নৈতিক বিচ্যুতি এবং কাঠামোগত অবহেলা। তৃণমূলের প্রতিটি খবরের কারিগর মফঃস্বল সংবাদকর্মীরা। শহর থেকে বহুদূরে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সংবাদের সন্ধানে ছুটেন মফস্বল সাংবাদিকরা। তবে তাদের পরিশ্রমের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বড় হয়ে ওঠে তাদের নিয়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা। কেন এই নেতিবাচকতা? শুধুই কি ব্যক্তিগত বিচ্যুতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো সংকট? মফস্বল সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ কোনো নির্দিষ্ট বেতন পান না। অনেক জাতীয় গণমাধ্যম তাদের নিয়োগ দিলেও বেতন দেয় না, উল্টো মাসোহারা বা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। জীবন ধারণের নূন্যতম নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক সাংবাদিক বাধ্য হয়ে 'হলুদ সাংবাদিকতা' বা অনৈতিক অর্থ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, যা পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর কলঙ্ক লেপে দেয়। মফস্বল পর্যায়ে সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখা হয় না। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কর্মীরা যখন সাংবাদিকতার কার্ড ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চান, তখন সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে যায়। পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাব এই নেতিবাচক ধারণাকে আরও উসকে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন বা প্রভাবশালীদের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে গিয়ে মফস্বল সাংবাদিকরা প্রায়ই হামলা, মামলা বা হুমকির শিকার হন। অনেক সময় নিরাপত্তার অভাবে তারা সত্য গোপন করতে বাধ্য হন অথবা প্রভাবশালী পক্ষের হয়ে সংবাদ পরিবেশন করেন। এতে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। মফস্বলের মানুষ অনেক সময় মনে করেন সাংবাদিকরা কেবল নিজেদের লাভের জন্য বা কাউকে হয়রানি করার জন্য ছবি তোলেন বা খবর লেখেন। এই ভুল ধারণা ও স্থানীয় রাজনীতিতে সাংবাদিকদের জড়িয়ে পড়া তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের অন্যতম কারণ। "আমরা জীবন বাজি রেখে খবর পাঠাই, কিন্তু দিনশেষে আমাদের কার্ডটাই পরিচয়, কোনো বেতন নেই। যখন কোনো সাংবাদিক পেটের তাগিদে আপস করেন, তখন পুরো মফস্বল সাংবাদিকতার দিকে আঙুল ওঠে।" বলছিলেন জাহাঙ্গীর আলম রুবেল নামে এক সংবাদকর্মী। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। শত বাধা সত্ত্বেও মফস্বল সাংবাদিকরাই দেশের বড় বড় দুর্নীতির খবর ব্রেক করেন। তাদের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় গণমাধ্যমগুলো সরগরম থাকে। কিন্তু তাদের এই পরিশ্রম অধিকাংশ সময় ঢাকা পড়ে যায় কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড আর কাঠামোগত অবহেলার কারণে। মফস্বল সাংবাদিকদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা দূর করতে প্রয়োজন তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা এবং একটি স্বাধীন মিডিয়া কাউন্সিল গঠন করা। সাংবাদিকদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধি নিশ্চিত করতে পারলে তৃণমূলের এই অতন্দ্র প্রহরীরা আবার মানুষের আস্থা ফিরে পাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করেন শিল্পী বণিক নামে মফঃস্বলের একজন সিনিয়র সাংবাদিক ।




























