
স্টাফ রিপোর্টার :
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওর—শুধু জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার নয়,এটি এক গভীর ইতিহাসের ধারকও। কিন্তু এই হাওরের নাম‘টাঙ্গুয়া’ কিভাবে এলো,তার সঠিক দলিল আজও ইতিহাসের অন্ধকারেই রয়ে গেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও অনলাইন গবেষণায় দেখা যায় হাওরের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত ও লোককথা,তবে একক দালিলিক প্রমাণ এখনও মেলেনি।
স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা হলো,‘টুঙ্গি’ বা‘টাংগি’ শব্দ থেকে ‘টাঙ্গুয়া’র উৎপত্তি। হাওরাঞ্চলে জেলেরা মাছ ধরার সময় পানির ওপর উঁচু কাঠের প্ল্যাটফর্ম বা মাচা বানাত, যাকে স্থানীয় ভাষায় টুঙ্গি বলা হতো। সময়ের ব্যবধানে উচ্চারণগত পরিবর্তনে সেই ‘টুঙ্গি’ থেকেই জন্ম নেয় ‘টাঙ্গুয়া’ নামটি। সংস্কৃত শব্দ“তুঙ্গ” অর্থাৎ উঁচু বা উচ্চ স্থান এই ব্যাখ্যাতেও টুঙ্গি থেকে টাঙ্গুয়ার রূপান্তর ভাষাতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন স্থানীয় ইতিহাস গবেষকেরা।
অন্যদিকে আরেকটি তত্ত্ব মতে,‘টাঙ্গুয়া’ নামটি এসেছে এ অঞ্চলের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা জমিদার পরিবারের নাম থেকে। প্রাচীন সময়ে এই এলাকায় বসবাস করতেন ‘টাঙ্গুয়া’ বা অনুরূপ উপাধিধারী এক জমিদার পরিবার,যাদের নামেই হাওরটির নামকরণ হয় বলে ধারণা করা হয়। তবে এ তত্ত্বেরও কোনো লিখিত বা সরকারি দলিল এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নথি, যেমন রামসার রিপোর্ট (১৯৯৯), আইইউসিএন-এর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বা বাংলাদেশ এনসাইক্লোপিডিয়া (Banglapedia) কোথাও টাঙ্গুয়ার হাওরের নামের উৎপত্তি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এসব নথিতে হাওরের আয়তন, জীববৈচিত্র্য,পরিবেশগত গুরুত্ব ও ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনা বিস্তারিত থাকলেও নামকরণের ইতিহাস অনুল্লেখিত থেকে গেছে।
তবে ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার, পুরনো মানচিত্র ও জমির মৌজা রেকর্ডে নামটির প্রাচীন ব্যবহার পাওয়া যায়—যা প্রমাণ করে, ‘টাঙ্গুয়া’ নামটি কমপক্ষে দেড় শতাব্দী ধরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। স্থানীয় ইতিহাসবিদরা মনে করেন,সেই সময়ের নথিপত্র ও মৌখিক ইতিহাস মিলিয়ে দেখলে হয়তো নামকরণের সঠিক উৎস পাওয়া যেতে পারে।
টাঙ্গুয়ার হাওর বর্তমানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। প্রায় ৯,৭২৭ হেক্টর আয়তনের এই জলাভূমি বছরে পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল, ১৪০ প্রজাতির মাছের আবাস এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস।
তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে ‘টাঙ্গুয়া’ নামটি ঠিক কার নামে,কিভাবে,কখন এলো? স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, “এই হাওরের নামের ভেতরই আছে এর ইতিহাস। হয়তো টুঙ্গি থেকে এসেছে, হয়তো কোনো টাঙ্গুয়া পরিবারের নাম থেকে কিন্তু হাওরটা আমাদের আত্মার অংশ।”
গবেষকরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর নাম ও ইতিহাসও সংরক্ষণ করা দরকার। ব্রিটিশ আমলের রেকর্ড, মৌজা মানচিত্র ও স্থানীয় লোককথার সমন্বয়ে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক গবেষণা হয়, তবে হয়তো উদ্ঘাটিত হবে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের নামকরণের সত্য উৎস।





























