
অভিজাত ক্লাব কিংবা বনেদি পরিবারের কোনো উৎসবের উদ্বৃত্ত-উচ্ছিষ্ট খাবারের এ বাণিজ্য বেশ পুরোনো হলেও তা হয়তো অনেকেরই অজানা ছিল। তবে যতদিন যাচ্ছে বাজারে নিত্যপণ্য অগ্নিমূল্য হচ্ছে। আর উদ্বৃত্ত বা উচ্ছিষ্ট খাবারের ক্রেতার শ্রেণিভেদও কমছে। একটা সময় শুধু ভিক্ষুক বা ভবঘুরে শ্রেণির মানুষই এ খাবারের ক্রেতা ছিল। সেখানে এখন যোগ হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষও। বিয়ে বাড়ি কিংবা ক্লাবের অনুষ্ঠানের ফেলে দেওয়া খাবার আমিষের ঘাটতি পূরণ করছে গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষের। রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ক্লাব আছে, যেখানে প্রতিদিনই থাকে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান। সঙ্গে থাকে খাবারের নানা আয়োজন। সমাজের উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত যেই হোক, সবার বিয়ে বাড়িতেই থাকে বিভিন্ন পদের খাবারের পশরা।
অতিথিরা এত পদের খাবার না খেতে পারায় অধিকাংশই থাকে উচ্ছিষ্ট। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নবিত্ত মানুষ কোনো রকমে আধাপেটে খেয়ে বেঁচে থাকে। আর্থিক অসংগতির কারণে এত পদের লোভনীয় খাবার তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। এসব দরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের তুষ্টি হয় বিয়ে বাড়ির সে উচ্ছিষ্টেই। সপ্তাহের প্রতি শুক্র এবং শনিবার বিভিন্ন বিয়ে বাড়ি কিংবা ক্লাবের অনুষ্ঠানের বিভিন্ন খাবারের বেঁচে যাওয়া আইটেম নিয়ে রীতিমতো বাজার বসে নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেটের সামনে।
এখানে বিকিকিনি হয় উচ্ছিষ্টের। সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানের খাবার বাবুর্চি বা বেয়ারাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হয় এ মার্কেটে। আর গরিব মানুষ সেসব খাবার কিনে নিয়ে যায় পরিবারের জন্য। আর একবেলা তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে স্বপ্ন পূরণ হয় পোলাও, কোরমা খাওয়ার। নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেটের সামনে ৪০ বছর ধরে উচ্ছিষ্ট খাবারের ব্যবসা করা কাশেম মিয়া জানান, আগে শুধু গরিব মানুষই ছিল এই খাবারের ক্রেতা। তবে বর্তমান সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষ বাজারের সদাইয়ের দামের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে এখান থেকেই খাবার কিনে নিয়ে যায় পরিবারের ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠানের জন্য।
কাশেম মিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় ধূপখোলা থেকে সালমা বেগম নামের একজন আসেন তার পরিবারের জন্য গরুর ও মুরগির মাংস কিনতে। এ সময় তার সঙ্গে কথা হলে জানান, তিনি মাঝেমধ্যেই আসেন খাবার কিনতে। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা দিয়ে কী করে কিনে খাব। তাই তো এখানে আসি, সামর্থ্য থাকলে কী আর আসতাম বাবা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার থেকে সংগ্রহ করা খাবারের পশরা সাজিয়ে বসেছেন এখানের দুই দোকানি। শুক্র ও শনিবার অন্য সব বাজারের মতো এখানেও চলে ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম। শনিবার বিকাল ৪টার দিকে দেখা গেল বেশ শোরগোল, অনেক ক্রেতার উপস্থিতি। কেউ কিনছেন কেউ বা ঘুরেফিরে দেখছেন।
পোলাও, কোরমা আর মাছ-মাংসের খাবারের পশরা সাজিয়ে দাম হাঁকেন বিক্রেতারা। এখানে মিলে কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, মুরগির রোস্ট-ফ্রাই, খাসির মাংস, গরুর মাংস, পায়েস, বোরহানি, জর্দা এবং টিকাসহ বিয়ে বাড়ির সব ধরনের খাবার। ছোট সাইজের প্রতি ডিশ গরুর মাংসের (৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম) দাম ৪০০ টাকা। মুরগির রোস্ট ৫০ টাকা পিস, ফ্রাই ভালো হলে ৫০ আর খারাপ হলে ১০ থেকে ২০ টাকা পিস। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় দেখা গেল একজন ৫ হাজার টাকার খাবার কিনে নিলেন। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, আজ বাসায় পারিবারিক এক অনুষ্ঠান আছে। সে জন্য গরুর রেজালা, মুরগির রোস্ট আর ফ্রাই টিকা নিলাম। বাজার থেকে এ খাবার কিনে রান্না করতে গেলে ১৫ হাজার টাকার ওপর খরচ পড়ে যাবে। ছোট কাজ করি, এত টাকা খরচ করব কী করে, তাই এখান থেকেই নিলাম।
এ সময় দেখা গেল এক বৃদ্ধা অল্প পরিমাণ গরু ও মুরগির মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আমি বাবা ভিক্ষা করি, ঘরে নাতি-মেয়ে আছে, ওগোর জন্য ২০০ টাকার মাংস নিলাম। এভাবেই একের পর এক ক্রেতা আসছে আর বিক্রি হচ্ছে নানা পদ। একজনকে দেখা গেল বাড়িতে তার চাচার জন্য ৪০ টাকার মোরগ পোলাও কিনে নিতে। আরেকজনকে দেখা গেল ৪ লিটার বোরহানি নিতে। তাকে জিজ্ঞেস করায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ব্যক্তি জানান, এই বোরহানি তিনি ফুচকার দোকানে ব্যবহার করবেন। এভাবেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এখানকার সব খাবারের আইটেম। একসময় সপ্তাহে ২ দিন এখানে খাবার পাওয়া গেলেও এখন সপ্তাহে ৪-৫ দিন পাওয়া যায় বিয়ে বাড়ির উচ্ছিষ্ট এসব খাবার। তবে শুক্র ও শনিবার বেশি আইটেম পাওয়া যায় বলে জানান দোকানদার শহিদ।
তিনি জানান, এসব খাবার তারা বিভিন্ন কমিনিউটি সেন্টারের বাবুর্চি-বেয়ারাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। গরিব মানুষের এসব খাবার ঘরে রান্না করে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অল্প টাকায় এখান থেকে সংগ্রহ করে পরিবার নিয়ে খেয়ে থাকে।





























