
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার কোনো ফুটপাতেই দিনের বেলায় হাঁটা যায় না। হকাররা কোথাও অস্থায়ী, আবার কোথাও স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে দোকান বসিয়েছেন। প্রতি দোকানের জন্য দিনে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেন তারা। শহরের প্রায় দেড়শ কিলোমিটার পাকা সড়কের বেশির ভাগের ফুটপাতই হকারদের দখলে। ৩০ হাজার হকারকে এসব ফুটপাত দখলে রাখতে মাসে সরল হিসেবে ১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। বছরে এই টাকার পরিমাণ ২১৬ কোটি টাকা। নগরীর ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত থাকলে ওই টাকার ভাগ পাবেন না রাজনৈতিক দলের স্থানীয় দখলদার কিংবা পুলিশ।
আগ্রাবাদের মতো নগরীর স্টেশন রোড, জুবলী রোড, নিউমার্কেট মোড়, চকবাজার, বহদ্দারহাট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, আমতলা, আন্দরকিল্লা, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আসাদগঞ্জ, ফিরিঙ্গিবাজার, লালদীঘি, জিইসি মোড়, মুরাদপুর, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সামনের সড়ক, অক্সিজেন, পাহাড়তলী অলংকার মোড়, একে খান গেট, বড়পুল মোড়, ইপিজেডসহ নগরীর বলতে গেলে সব সড়কের ফুটপাতই এখন হকারদের ব্যবসাস্থল।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নগরীর স্টেশন রোড, আমতল ও নিউমার্কেট মোড় হকারমুক্ত করতে সপ্তাহব্যাপী অভিযান চালায়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের অসহযোগিতা ও হকারদের পেছনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধন থাকায় চসিকের সেই অভিযানে সাফল্য আসেনি।
মঙ্গলবার বিকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বটতলী রেলস্টেশন থেকে নিউমার্কেট মোড়ের আগ পর্যন্ত আবারও হকাররা ফুটপাত দখল করে পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন। হকাররা দুভাগে ভাগ হয়ে এক ভাগ ব্যবসা করছেন, অন্যভাগের লোকজন হকার্স মার্কেটের সামনে জড়ো হয়ে মেয়রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন।
একসময় তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে ফুটপাতের হকারমুখী ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। কিন্তু সাধারণ নগরবাসীর জন্য সেই দিন আর এখন নেই। চাঁদা দিতে দিতে অতিষ্ঠ হকাররা তাদের পণ্যের দামও বাড়িয়েছেন। ক্ষেত্রবিশেষে এখন দোকানের চেয়ে বেশি দামে ফুটপাতের পণ্য কিনতে হয়। তবু হকাররা ফুটপাত ছাড়ে না। কারণ চাঁদার টাকা আর পণ্যের দাম দিনশেষে ক্রেতার কাঁধেই ওঠে।
হকার্স নেতারা জানান, নগরীর ফুটপাতে কমবেশি ৩০ হাজার দোকান রয়েছে। জানা যায়, প্রত্যেক দোকানের জন্য দিনে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিলে ৬০ লাখ টাকা ওঠে। মাসে এ টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিমাণ টাকা দিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বছর শেষে সব হকারের পুনর্বাসন সম্ভব।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসহপতি প্রকোশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ফুটপাত ছাড়া নগর হয় না। ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ দোকান থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। হকারদের একরাতে সরাতে গেলে তারা চুরি, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়াতে পারে। তিনি বলেন, শুনেছি হকাররা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে চাঁদা দেন। যদি সরকারিভাবে বৈধ উপায়ে এ চাঁদা আদায় করা যায়, তা হলে বছর শেষে ওই টাকায় হকারদের জন্য বহুতল শপিংমল করে তাদের পুনর্বাসন সম্ভব। এতে নগর হবে আরও সুশৃঙ্খল।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হকার্স সমিতির সভাপতি মিরন হোসেন মিলন বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় ৩০ হাজার হকার আছে। সিটি করপোরেশন তাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আলোচনা ছাড়া উচ্ছেদ শুরু করেছে। অবিলম্বে হকারদের নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ ও সময়সূচির নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
হকাররা চাঁদা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে রাজি নন কেউ-ই। তারা বলছেন, টাকা নিয়ে সংবাদ প্রচার হলে দোকান বসানোই অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিগড়ে যাবে পুলিশ কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাঁদার টাকা বাড়িয়ে দেবেন।
আগ্রাবাদ এলাকার এক হকার জানান, চাঁদার টাকা না দিলে দোকান রাখা অসম্ভব। লাইনম্যানরা টাকা তুলে নেন। এ টাকা কোথায় যায় আমরা জানি না। শুনেছি ভাগাভাগি হয়ে অনেকের পকেটে যায়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি দক্ষিণ) নোবেল চাকমা বলেন, সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েছে। আমরা সহযোগিতা করেছি। নিউমার্কেট থেকে সব হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের দুটি টিমও কাজ করছে। তবে এক পাশে পুলিশ উচ্ছেদ করলে অন্যপাশে হকাররা আবার বসে যাচ্ছেন।
পুলিশের চাঁদা গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, এ রকম কোনো অভিযোগ পাইনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে চাঁদাবাজ যে কারও বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।
জানা গেছে, চসিকের অভিযান শুরুর পর হকাররা দল বেঁধে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। তারা ফুটপাতে দখলদারিত্ব বজায় রাখতে তার সহযোগিতা চেয়েছেন। মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী পর্যাপ্ত সময় দিয়ে তাদের কথা শুনেছেন। তবে এসব ব্যাপারে কিছু বলতে সম্মত হননি তিনি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের একান্ত সচিব আবুল হাশেম বলেন, আমরা আবারও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করব। আমরা জানি ফুটপাত দখলে রাখতে এই শহরের কিছু প্রভাবশালী তাদের সহযোগিতা করেন। ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলে রাখার জায়গা নয়। অতীতে হকারদের সময় বেঁধে হকারদের এসব জায়গায় বসতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে স্থায়ীভাবে ফুটপাত দখল করে বসেন।





























