
গতকাল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ঝরে পড়েছে এক গভীর, ভারী ও আবেগে ভেজা অধ্যায়। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নয় একটি সময়, একটি সংগ্রাম, একটি নৈতিক নেতৃত্বের ধারা চিরতরে থেমে গেল। তিনি ছিলেন এমন এক রাষ্ট্রনায়িকা, যাঁর জীবন রাজনীতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মানুষের মনে, আচরণে ও মূল্যবোধে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর পথচলা শুরু হলেও তিনি কখনোই পরিচয়ের ছায়ায় আবদ্ধ থাকেননি। স্বল্পভাষী, সংযত অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি নিজস্ব নেতৃত্ব নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাননি; পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির ভেতরে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্বের শক্তি উচ্চকণ্ঠে নয়, দৃঢ়তায়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার রাষ্ট্রের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তাঁর অবস্থান ছিল স্থির ও আপসহীন। ক্ষমতায় থাকাকালীন বহুদলীয় গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার প্রয়াস ছিল তাঁর শাসনের বৈশিষ্ট্য। আবার ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন মামলা, কারাবাস ও নিপীড়নের ভেতর দিয়ে অসুস্থ শরীর নিয়েও মাথা নত করেননি। নীরবতা দিয়েই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অতি সাধারণ। পরিপাটি, মার্জিত, মিতব্যয়ি ও স্বল্পভাষী এক নারী। তিনি ফুল ভালোবাসতেন প্রদর্শনের জন্য নয়, সৌন্দর্য আর নীরবতার প্রতীক হিসেবে। রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থেকেও তাঁর জীবনে আড়ম্বর ছিল না। এই সংযমই তাঁকে মানুষের এত কাছে এনে দিয়েছিল।
এই মিতব্যয়িতা ও সরলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছে ১৯৭৭ সালের একটি ঘটনা। তখন তিনি সেনাপ্রধানের স্ত্রী। রাষ্ট্রীয় নিয়মে বড় গাড়ি, আনুষ্ঠানিকতা ও সুবিধা পাওয়ার অধিকার ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি নেমেছিলেন একটি অতি সাধারণ, হুডখোলা গাড়ি থেকে। কোনো প্রহরা নয়, কোনো গর্জন নয় নেমে সরাসরি ঢুকে পড়েছিলেন মনসুর ভবনে।
ভবনের সামনের কসমেটিকসের দোকানে দাঁড়িয়ে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেছিলেন, “একটা ভালো ক্রিম দেখান তো।” ‘জিয়ার স্ত্রী’ পরিচয়ে দোকানদার বাড়তি যত্নে ‘Made in Japan’ লেখা Miko ব্র্যান্ডের একটি ক্রিম এগিয়ে দিল। দাম ৪৫ টাকা।
দাম শুনে বেগম জিয়া জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলে ফেলেছিলেন, “ওরে বাবা! এত টাকা!” মুহূর্তেই বলে উঠলেন-“না না, কম দামের কিছু দেন।” দোকানদার অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সেই অস্বস্তি ভাঙতে তিনি নিজেই বললেন, “আমায় বরং কিউটের ক্রিম দিন। দেশি প্রোডাক্টই ভালো।”
ততক্ষণে মনসুর ভবন লোকে লোকারণ্য। মানুষ বিস্ময়ে দেখছিল। দুর্ভিক্ষ আর বৈষম্যে জর্জরিত বাংলাদেশ এমন দৃশ্য দেখেনি। চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়েছিল-“বাংলাদেশে এও কি সম্ভব!” এই প্রশ্নটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় প্রশংসা।
এটি কোনো ছোট ঘটনা নয়। এটি ছিল ক্ষমতার ভেতরে থেকেও সাধারণ থাকার এক বিরল নৈতিক ঘোষণা। এখানেই বেগম খালেদা জিয়া আলাদা তিনি ক্ষমতাকে ব্যবহার করেননি নিজেকে বড় দেখাতে, বরং নিজের আচরণ দিয়ে ক্ষমতাকে ছোট করে এনেছিলেন মানুষের কাছে।
তার ইন্তেকালের পর অনুষ্ঠিত জানাজা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জানাজাগুলোর একটি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি কোনো দলীয় আয়োজন ছিল না এটি ছিল মানুষের শেষ ভালোবাসা। লাখো মানুষের নীরব অশ্রু বলে দিয়েছে, তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি ছিলেন মানুষের আপন মানুষ।
আজ তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে সংসদের সম্মুখে, ইতিহাসের বুকের ভেতরে। দুটি কবর পাশাপাশি এটি কেবল দাম্পত্য নয়, এটি রাষ্ট্রের ইতিহাস। যেন হুমায়ুন আহমেদের সেই পংক্তিই বাস্তব হয়ে উঠেছে- “যদি আমায় মরণ এসে ছুঁয়ে যায় তবে তুমি থেকো পাশে, আমরা দুজনা থাকব ঘুমায়ে মাটির মিঠে ঘাসে।”
একজন স্বাধীনতার ঘোষক, অন্যজন গণতন্ত্রের প্রতীক দুজনেই আজ নীরবে শুয়ে আছেন এই দেশের মাটিতে। যে দেশের মাটি ও মানুষকে ছেড়ে তিনি কখনই অন্যদেশে চলে যেতে চাননি।
বেগম খালেদা জিয়া এখন ইতিহাস। কিন্তু এই ইতিহাস কোলাহলের নয় এটি নীরব শক্তির ইতিহাস। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন জানতে চাইবে নেতৃত্ব কাকে বলে, তখন এই জীবনের পাতাই হবে উত্তর। আল্লাহ তাঁর সংগ্রামী জীবনের প্রতিদান হিসেবে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখক: ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি, চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী







































