
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) এক অফিস আদেশে বলা হয়েছিল, তাঁর বদলি ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হবে। খাতা-কলমে তিনি এখন বগুড়ার পাটবীজ দপ্তরের কর্মকর্তা। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যপট ভিন্ন। রাজশাহীর পাটবীজ দপ্তরে ১৬ বছর ধরে জেঁকে বসা মো. হারুন অর রশিদ বদলি হয়েও রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। প্রশাসনিক নির্দেশের চেয়েও এখানে বড় হয়ে উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও শ্রমিক লীগের দাপট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএডিসির সংস্থাপন বিভাগ থেকে সীড টেস্টার মো. হারুন অর রশিদকে রাজশাহী থেকে বগুড়ায় বদলি করা হয়। নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলা হলেও এই আদেশ জারির পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন।
প্রশ্ন উঠেছে, বদলি হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি এখনো বিএডিসি শ্রমিক কর্মচারী লীগ (সিবিএ)-এর রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতির পদ আঁকড়ে ধরে আছেন?
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হারুন অর রশিদ কেবল একজন কর্মচারী নন, তিনি রাজশাহী অঞ্চলের শ্রমিক রাজনীতির এক ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় শ্রমিক লীগের সামনের সারির নেতা হিসেবে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। মিছিলে-সমাবেশে তাঁকে সবসময় অগ্রভাগে দেখা যেত।
এক শ্রমিক সংগঠক বলেন, “বিগত সরকারের সময় জাতীয় শ্রমিক লীগের যেকোনো বড় কর্মসূচিতে হারুন অর রশিদ মানেই ছিল সামনের সারি। এই রাজনৈতিক পুঁজি ব্যবহার করেই তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন।”
হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৬ বছর এক কর্মস্থলে থাকার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগ আছে, উপ-পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। তবুও অদৃশ্য খুঁটির জোরে বারবার পার পেয়ে গেছেন তিনি।
বিএডিসির ভেতরের একটি সূত্র জানায়, রাজশাহী জেলা শাখায় তাঁর বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে না ওঠায় কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতারাও তাঁকে সরাতে নারাজ। মাঠপর্যায়ে শ্রমিকদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও এক ধরনের চাপে থাকেন।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মচারী আক্ষেপ করে বলেন, “বদলি কাগজে হয়, কিন্তু ক্ষমতা থাকে মাঠে। হারুন রশিদের ক্ষেত্রে এটাই বাস্তব। তিনি যেটা বলেন, সেটাই আইন।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. হারুন অর রশিদ বলেন, “আমি বিএডিসি শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলাম, এটা সত্যি। তবে আমি কোনো অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।”
অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএডিসি রাজশাহীর উপ-পরিচালক (পাটবীজ) এইচ এস জাহিদুল ফেরদৌসকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নমনীয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করার কারণেই বিএডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরছে না। ১৬ বছর ধরে একই এলাকায় অবস্থান করে প্রভাব বলয় তৈরি করা একজন কর্মচারীকে বদলি করা হলেও কেন তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন না, তা নিয়ে খোদ কর্পোরেশনের ভেতরেই ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
কর্মস্থল বদলেছে ঠিকই, কিন্তু রাজশাহীতে হারুন অর রশিদের ক্ষমতার ‘সাম্রাজ্য’ এখনো অটুট।




































