
প্রশাসন ও কৃষি অধিদপ্তরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা
চাষাবাদের জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেড়শ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে তামাক। প্রশাসন ও কৃষি অধিদপ্তরের সঠিক তদারকি না থাকায় টোবাকো কোম্পানিগুলো একশ্রেণির চাষির নানা প্রলোভনে ফেলে তামাক চাষে বাধ্য করছে। উপজেলার অন্তত আটটি ইউনিয়নে ফসলি জমির পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদে তামাক চাষের পরিধি বেড়ে চলছে। ফলে ফসলি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন।
গত কয়েক বছর চকরিয়ায় সাড়ে চারশ থেকে ৫০০ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হতো; কিন্তু এ বছর তা বেড়ে সাড়ে ছয়শ হেক্টরে পরিণত হয়েছে। আর এসব তামাক পোড়াতে বনাঞ্চলের আশপাশে ও লোকালয়ে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার তামাক চুল্লি। আরও শতাধিক তামাক চুল্লির নির্মাণকাজ চলছে।
সচেতন মহল অভিযোগ তুলে বলেন, প্রতি বছর যেভাবে উপজেলাজুড়ে তামাকের আগ্রাসন বেড়ে চলেছে, তাতে কৃষি ফসল ও ধান উৎপাদনে বড় ধরনের অশনি সংকেত দেখা দিচ্ছে।
চকরিয়া-পেকুয়াসহ পুরো কক্সবাজারে তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে এনজিও সংস্থা উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)। সংস্থাটির কক্সবাজারের সমন্বয়ক মো. জয়নাল আবেদিন খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চকরিয়া উপজেলাসহ কক্সবাজার অঞ্চলে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারে কাজ করছি। তামাক চাষের কারণে যেমন জমির উর্বরতা শক্তি লোপ পায়, তেমনি তামাক চাষের ফলে চাষি এবং আশপাশের লোকজন নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়ন, সুরাজপুর -মানিকপুর ইউনিয়ন, বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এবং মাতামুহুরী নদী তীরের বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, কৈয়ারবিল, বরইতলী ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের বিপুল পরিমাণ খাস জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। এতে একে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, দ্বিতীয়ত বাতাসে বিষক্রিয়ায় ছড়াচ্ছে নানা রোগব্যাধি। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফেলছে ক্ষতিকর প্রভাব।
উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের কৃষক জহির আহমদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা চাষাবাদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। মাঝে মাঝে নামমাত্র কিছু সার দেয়। এগুলোতে কিছুই হয় না। তামাক চাষে আমাদের অগ্রিম টাকা দেয়, চাষাবাদের যাবতীয় ব্যয় বহন করে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো। তাই তামাক চাষ করি।
কাকারা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা মাটিরাঙ্গা আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক আকতার মারুফ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে তামাকের ব্যাপারে বলে আসছি। বাড়ির আঙ্গিনা, নদীর চর, সরকারি খাস জায়গা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় এখন ছড়িয়ে পড়েছে তামাক চাষ। বিশেষ করে তামাকের চুল্লিগুলো লোকালয়ের বাইরে স্থাপন ও চুল্লিতে বনের গাছ পোড়ানো বন্ধের কথা আমরা বারবার বলে আসছি। কিন্তু প্রশাসন ও তামাক কোম্পানিগুলো কিছুতেই কর্ণপাত করছে না। তাদের আস্কারায় তামাক চাষিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে বন, পরিবেশ ও প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে।’
অধিক হারে তামাক চাষ হওয়া সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, ‘লোভের ফাঁদে পড়ে কৃষকরা তামাক চাষে নেমেছে। টোব্যাকো কোম্পানিগুলো আমাদের চাষিদের নানাভাবে লোভ দেখিয়ে তামাক চাষে বাধ্য করছে। নদী-পাহাড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জনপদ এখন তামাক চাষের অভয়ারণ্য। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে কী পরিমাণ তামাক চাষ করবে, তা নির্ধারণ করে দেবে।
প্রতি বছর তামাক চাষের পরিধি বাড়তে থাকায় উপজেলার আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতে করে চরমভাবে হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার খাদ্য নিরাপত্তা। আগামীতে চকরিয়া উপজেলায় চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসএম নাছিম হোসেন বলেন, ‘সরকারিভাবে তামাক চাষ বন্ধে এ পর্যন্ত কোন ধরনের দিকনির্দেশনা নেই। এরপরও আমরা তামাকের বিকল্প উচ্চ মূল্যের যে ফসল আছে তা চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করব। তামাকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘তামাকের বিকল্প চিনা বাদাম, ভুট্টা, বারো মাসি মরিচসহ নানা প্রজাতির উচ্চ মূল্যের ফসল চাষ করা যায়। যেটা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে চাষিদের নিয়ে উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে আমরা কৃষকদের মধ্যে হস্তান্তর করি।’





























