
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জীবনরেখা, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। একসময় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এই বন এখন নিজেই হয়ে পড়ছে দুর্বল । সদ্য প্রকাশিত আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা বলছে, গত ২৫ বছরে সুন্দরবনের একটি বড় অংশ তার স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার ক্ষমতা-যাকে বিজ্ঞানীরা ‘রেজিলিয়েন্স’ বলেন-তা উল্লেখযোগ্যভাবে হারিয়েছে। এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি দেশের কোটি মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকারও প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘কমিউনিকেশন আর্থ অ্যান্ড এনভারমেন্ট’ একটি জার্নালের সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে গত ৭ এপ্রিল। এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থা। এতে পরিবেশ বিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-বিজ্ঞান ও গ্রহবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা নিবন্ধ, রিভিউ, মন্তব্য ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। সুন্দরবন নিয়ে এই জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা তথ্যে বলা হয়েছেÑ ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সুন্দরবনের প্রায় ৬১০ থেকে ৯৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকার বাস্তুসংস্থান দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সিডর, রেশমি ও আইলার মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় বনের কোমর ভেঙে দেয়। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বনের দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্যাঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা থেকে শরণখোলা রেঞ্জ পর্যন্ত এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গবেষকরা এই ঘটনাকে বলছেন ‘ক্রিটিক্যাল স্লোয়িং ডাউন’Ñএকটি পর্যায় যেখানে কোনো বাস্তুতন্ত্র আঘাত পাওয়ার পর আর আগের অবস্থায় দ্রুত ফিরে যেতে পারে না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর বন দ্রুত পুনরুদ্ধার হতো, এখন সেই ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলো সাইক্লোন সিডর, সাইক্লোন রেশমি ও সাইক্লোন আইলা বনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে গেছে, যা আজও পূরণ হয়নি।
সুন্দরবনের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এই সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনের দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলÑবিশেষ করে সাতক্ষীরা থেকে শরণখোলা রেঞ্জ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এসব এলাকায় গাছের বৃদ্ধি কমে যাচ্ছে, অনেক গাছ মারা যাচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক দেয়াল। কিন্তু এই দেয়াল এখন নিজেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ততার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ। এই গাছেই এখন ‘টপ ডাইং’ বা আগামরা রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে গাছের উপরের অংশ শুকিয়ে যাচ্ছে, চাঁদোয়া ছোট হয়ে আসছে, বন হয়ে উঠছে পাতলা।
জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী আঘাত
সুন্দরবনের দুর্বল হয়ে পড়া শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কাও। গবেষণার তথ্য বলছেÑ প্রতি বছর প্রায় ১৬.৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কাঠের ক্ষতি হচ্ছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, বনের কিছু অংশ এখন কার্বন শোষণ করার বদলে উল্টো কার্বন নিঃসরণ করছে। অর্থাৎ, যে বন একসময় জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে সহায়তা করত, সেটিই এখন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অংশ হয়ে উঠছে। এতে শুধু গাছপালা নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল বাঘ, হরিণ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বাসস্থান হুমকির মুখে পড়ছে।
মানবসৃষ্ট সংকটে বনের ওপর অদৃশ্য চাপ
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ডও সুন্দরবনের ক্ষতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শরণখোলা এলাকার বনজীবী হামিদ আলী বলেন, আগে বনে ঢুকলে বড় বড় গাছের কারণে অন্ধকার লাগত। এখন বন অনেক পাতলা হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগÑঅবৈধভাবে বড় গাছ কাটা হচ্ছে। বনের ভেতরে চিংড়ি ঘের তৈরি করা হচ্ছে। বাঁধ দিয়ে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এতে করে পলি জমা কমে যাচ্ছে, মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে ও বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উজানের প্রভাবে ফারাক্কার ছায়া
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ভারতের উজানে নির্মিত ফারাক্কা বাঁধসহ বিভিন্ন বাঁধের কারণে গঙ্গা নদীর পানির প্রবাহ কমে গেছে। এর ফলে সুন্দরবনে মিঠা পানির সরবরাহ কমেছে। মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে ফসফরাসের মাত্রা। অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে মাটিতে। এই পরিবর্তনগুলো গাছের পুষ্টি গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে, যা দুর্বল করে দিচ্ছে পুরো বাস্তুতন্ত্রকে।
করণীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। গড়াইসহ সুন্দরবনের শাখা নদীগুলো খনন করে উজান থেকে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। ড্রোন ও স্মার্ট প্যাট্রোলিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বনজীবীদের বন রক্ষার কাজে যুক্ত করে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পুনর্বনায়ন কর্মসূচি নিতে হবে। যেসব এলাকায় বন দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছ লাগাতে হবে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সুন্দরবন
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের ধ্বংস মানে শুধু একটি বন হারানো নয়-এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পতন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুন্দরবনের এই অবস্থা দেশের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে এই বনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উজানে বাঁধ নির্মাণ, শিল্প দূষণ, অবৈধ দখল ও বনসম্পদ লুটপাট বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সরকারকে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।




































