
যারা বছরে এক-দুবার মুরগির মাংস খেতেও হিমশিম খেতেন, তারা এখন প্রতি সপ্তাহেই খাচ্ছেন। একসময় একটি ডিম কেটে পরিবারের চারজন ভাগ করে খেতেন; এখন একবেলায়ই একজন একটি করে ডিম খেতে পারেন। এসবই সম্ভব হয়েছে দেশে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশের ফলে। নব্বইয়ের দশকেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষের আমিষ ও প্রোটিনের চাহিদায় যে ঘাটতি ছিল, তা অনেকটাই পূরণ করেছে পোল্ট্রি শিল্প। কিন্তু আজ এই শিল্পই হুমকির মুখে। খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, পণ্য আমদানিতে কর বৃদ্ধি এবং নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে হাজার হাজার খামারি নিঃস্ব ও বেকার হয়ে পড়ছে। ফলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্প এখন খাদে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ত পাঁচ বছরে পোল্ট্রি খাতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন অসংখ্য উদ্যোক্তা। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বাজেটে করপোরেট কর এক লাফে সাড়ে ১২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ থেকে ২৭.৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। টার্নওভার করও দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক বৃদ্ধির কারণে পোল্ট্রি খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম দফায় দফায় বেড়েই চলেছে। এর ফলে উদীয়মান পোল্ট্রি শিল্প চরম সংকটের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পোল্ট্রি খাতে করের বোঝা অর্ধেকে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন খাত-বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও কর অব্যাহতির ব্যবস্থা রাখা জরুরি। একই সঙ্গে আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কোন দেশে কর ও শুল্কে কী সুবিধা
২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফিড মিলগুলো টার্নওভারের ভিত্তিতে মাত্র সাড়ে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে থাকে। ভারতে সাধারণ আমদানিতে কোনো অগ্রিম আয়কর নেই এবং সেখানে ২০২৬ সালে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর থেকে টিসিএস (উৎসে কর) পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে পশুখাদ্য আমদানিতে এখনও পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর বহাল।
বেড়েছে খরচ, কমেছে প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) দেওয়া তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমেছে প্রবৃদ্ধি হার। ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ১০০ কে ভিত্তি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২২ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১১৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে (প্রাক্কলিত) প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৯০ শতাংশ।
খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, খামারির ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই খরচ হয় খাদ্যে। কম দামে খামারিদের খাদ্য দিতে হলে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। আর এজন্য আয়কর ও শুল্ক কমাতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরিতে যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়সহ নানা সুবিধা দিতে হবে।
কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোনো খাতে এত উচ্চ কর নেই। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিলেও আমাদের দেশের চিত্র উল্টো।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা এবং পোল্ট্রি শিল্পের উন্নতি এবং প্রান্তিকদের রক্ষা করতে হলে কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। প্রান্তিকরা না থাকলে পুরো শিল্পটি করপোরেট কোম্পানির অধীনে চলে যাবে। তখন ওইসব করপোরেট কোম্পানির বেঁধে দেওয়া দামেই ভোক্তাদের মাছ, ডিম, মুরগি ও মাংস কিনতে হবে।
এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত উল্লেখ করে মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, যাদের বড় একটি অংশ তরুণ উদ্যোক্তা। খামার বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো এই বিশালসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হারানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধস নামা।
বিপিআইএর মহাসচিব মো. সাফির রহমান বলেন, আগামী বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পে বিশেষ সুবিধা দেওয়া না হলে কেউ এতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবেন না। উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। জড়িতরা বিকল্প খাতে চলে যাবেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছরে পোল্ট্রি খাতে কর ও শুল্ক বাড়ানোর প্রভাব সবার ওপরে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকারকে সব ধরনের কর ও শুল্কে নমনীয় হতে হবে। তার মতে, টার্নওভার কর ০.২ শতাংশে নামিয়ে এনে মোট মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করা এবং করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশে নামালে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে। এআইটি ১ শতাংশ করার পাশাপাশি টাকা ফেরতের জটিলতা নিরসন ও টিডিএস কমানো দরকার।






































