
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে মূলত দুটি রাজনৈতিক বলয়ই পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। একটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অন্যটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (আওয়ামী লীগ)। মাঝে কিছু জোট, কিছু ভাঙন, কিছু নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও চূড়ান্ত ফলাফলে এই দুই শক্তির বাইরে বড় ধরনের বিকল্পের উত্থান ঘটেনি।
১৯৯১: প্রত্যাবর্তনের নির্বাচন
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘ সামরিক ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। জনগণ তখন পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিল—কিন্তু সেই পরিবর্তনও ছিল দুই প্রধান ধারার একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
১৯৯৬: পালাবদলের সূচনা
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। একই বছরে ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও জুনের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। তবু বিকল্প শক্তির বিকাশের বদলে দুই প্রধান দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
২০০১: জোট রাজনীতি ও নিরঙ্কুশতা
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল আসনে জয়লাভ করে। ভোটের রাজনীতিতে ‘প্রতীক’ তখন হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রধান বাহন। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় পরিচয়ের আড়ালে চলে যায়।
২০০৮: বিপুল ম্যান্ডেট
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পায়। এটিও ছিল এক প্রকার প্রতীক-নির্ভর গণ রায়। নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যক্তি নয়, দলীয় প্রতীকই হয়ে ওঠে বিজয়ের পূর্বশর্ত।
২০১৪ ও ২০১৮: অংশগ্রহণ ও আস্থার প্রশ্ন
২০১৪ সালের নির্বাচন বড় দলের বর্জনের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বহু আসনের জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনও আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কে আবদ্ধ হয়। তবু কাঠামোগত বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে—ক্ষমতার বলয়ে মূলত দুই দলের আধিপত্য।
২০২৪-পরবর্তী প্রত্যাশা ও ২০২৬-এর বাস্তবতা
৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকের মনে হয়েছিল, এবার হয়তো রাজনীতিতে নতুন কোনো বিকল্প শক্তির উত্থান ঘটবে। কিন্তু ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আবারও দেখালো—এক বলয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য বলয়ের নিরঙ্কুশ বিজয়ই ঘটেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থাৎ বলয় বদলেছে, কিন্তু বলয়ের কাঠামো বদলায়নি।
প্রতীক-নির্ভর ভোটার: ব্যক্তি নাকি দল?
বাংলাদেশের ভোটার আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোট ‘প্রার্থী’ নয়, ‘প্রতীক’-এর পক্ষে পড়ে। এটি আংশিকভাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল, আংশিকভাবে সংগঠনভিত্তিক নির্বাচনী বাস্তবতার পরিণতি। স্থানীয় জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিগত সততা অনেক সময় দলীয় প্রতীকের বিপরীতে দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারে না। ফলে বিকল্প চিন্তা বা নতুন দল সংগঠিত হওয়ার আগেই কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—এটি কি উদারনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর? গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা, মতবৈচিত্র্য ও বিকল্পের উপস্থিতি অপরিহার্য। যদি রাজনৈতিক পরিসর কেবল দুই বলয়ের মধ্যে আবর্তিত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা নীতিনির্ধারণের বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করতে পারে।
কেন বিকল্প শক্তি উঠে আসছে না?
১. সংগঠনগত শক্তি ও মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক: দুই প্রধান দলের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। নতুন শক্তির পক্ষে তা গড়ে তোলা কঠিন।
২. নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রকৃতি: প্রথম-গতিপ্রাপ্ত (First-Past-The-Post) পদ্ধতিতে বৃহৎ দল সুবিধা পায়, ছোট দল ছিটকে যায়।
৩. রাজনৈতিক মেরুকরণ: সমাজে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন ভোটারদের নিরাপদ বলয়ে আশ্রয় নিতে প্ররোচিত করে।
৪. প্রতীকের আবেগীয় শক্তি: মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় পরিচয়—এই বৃহৎ বয়ানগুলো দলীয় প্রতীকের সঙ্গে মিশে গেছে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
বাংলাদেশ কি দুই বলয়ের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার দিকে যেতে পারবে? নাকি প্রতিবারই এক বলয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য বলয়ের উত্থান ঘটবে? গণঅভ্যুত্থান, সামাজিক আন্দোলন কিংবা তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা—এসব কি সংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ নেবে?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর। প্রতীক-নির্ভরতা থেকে নীতি-নির্ভরতার দিকে অগ্রসর না হলে নির্বাচন কেবল পালাবদলের উৎসব হয়ে থাকবে; কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হবে না।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিযোগিতায়—আর সেই প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ, যখন বিকল্প সত্যিকার অর্থেই বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: মো. সেলিম হাসান দুর্জয়, সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)





























