
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পালাবদল- এই অস্থির সময়ে ধস নেমেছে দেশের পর্যটন ব্যবসায়।
পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, অস্থিরতার এক মাসে অন্তত হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছেন তারা। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কীভাবে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ভর করেছে তাদের মধ্যে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদেশে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে, যা কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতে প্রাণ ফেরানো যেতে পারে। তা ছাড়া দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকেও দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার বার্তা প্রচার করতে বলা হচ্ছে।
১৫ জুলাই কোটা আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে, যার পরিণতি আসে শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে; গঠন হয় অন্তর্বতী সরকার।
তবে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত সেই অস্থিরতা কাটেনি, এখনও স্বাভাবিক হয়নি দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে না থাকায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভ্রমণ পরিকল্পনা করেও অনেকে বাতিল করেছেন।
আন্দোলন ঘিরে বিদেশি পর্যটকরা তো আসেইনি, উপরন্তু অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকারীদের দেখা মেলেনি দেশের প্রধান পর্যটন স্পটগুলোতে।
১৫ জুলাইয়ের পর থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত কক্সবাজার, রাঙামাটি, সিলেট, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ দেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো প্রায় প্রাণহীন দেখা যায়।
পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা হোটেল-মোটেলগুলো বিভিন্ন সুবিধার ‘অফার’ দিয়েও পর্যটকদের টানতে পারছেন না। ওইসব এলাকার বড় বড় রেস্তোরাঁগুলোও এখন সুনশানপ্রায়।
পর্যটনভিত্তিক বিমানযাত্রীও নেই সেভাবে। অভ্যন্তরীণ রুটের বেশিরভাগ ফ্লাইটে যাত্রীখরা রয়েছে। আর ফ্লাইট ধরা বিদেশি পর্যটক, সে তো এখন ধরাছোয়ার বাইরে বলা চলে।
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন- এই সময়ে বাংলাদেশ পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। ফলে বিদেশের চলাচল সীমিত হয়ে যায়, আবার অনেকে বাংলাদেশ ছেড়ে নিজ দেশে চলে যায়।
পর্যটনের পুরো ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ার এই সময় থেকে কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন এই খাতের বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন স্তরের ট্যুর অপারেটরা।
দেশের পর্যটনের ব্যস্ততম স্থান কক্সবাজার সমুদ্র সৈতককেন্দ্রিক ব্যবসায় ভাটা চলছে। সেখানকার একটি তিন তারকা হোটেলের ব্যবস্থাপক সুনীল বড়ুয়া বলেন, “আমাদের এখানে মাসখানেক আগেও বেশ ভালো অবস্থা ছিল। হোটেলে সিঙ্গেল রুম বুকিংয়ের চাপ ছিল। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে বুকিং কমতে-কমতে এখন পর্যটক নেই বললেই চলে। সমুদ্র সৈকতও সুনশানপ্রায়।”
সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি এবং কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেড অ্যালার্টও জারি করে। এ জন্য সব অগ্রিম বুকিং বাতিল হয়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন পর্যটনকর্মীরা।
কূটনৈতিক পাড়া থেকে খবর আসছে, কিছু দেশ ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি ভিসা জমাও নিচ্ছে না।
এসব কারণে পর্যটন খাত এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছে বলে দাবি করে ট্যু অপারেটররা বলছেন, অস্থিরতার এই সময়ে নিট ক্ষতি হয়েছে দেড়শ কোটি টাকার মতো। এ ক্ষতি বছর শেষে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দেশের ট্যুর অপারেটরদের সংগঠন টোয়াব এর সভাপতি মোহাম্মদ রাফেউজ্জামান বলছেন, “আসলে প্রতিকূল পরিবেশে পর্যটন বেগবান হয় না। কাঠামোগত সুবিন্যাসের পাশাপাশি জলবায়ু, পরিবেশ আবহাওয়া সব কিছুর ওপরই পর্যটনের ব্যবসা নির্ভর করে।
“গত এক মাসে এই শিল্প আরও স্থবির হয়েছে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশিরাও আসছে না, দেশের মানুষও নিরাপত্তাশূন্যতায় ভুগছে; ফলে তারা বের হচ্ছে না। এতে অন্তত হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছে পর্যটন খাত।”
দেশে সাধারণত পর্যটনের মৌসুম ধরা হয় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সে হিসেবে এখন পর্যটনের মৌসুমও নয়। এখন ব্যবসা টিকিয়ে চলার সময়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন ফেইসবুক-ভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপ ‘চলো ঘুরি’-এর সমন্বয়ক তাহসিন ইসলাম।
তিনি বলেন, “এই সময়ে আমরা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, রাতারগুলে ট্যুর প্যাকেজ ছাড়তাম। এবারও ছেড়েছিলাম, কিন্তু, যাতায়াত ব্যবস্থা কিছুদিন বন্ধ থাকায় পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
“হাউজ-বোট বুকিং করা ছিল, সেটাও বাতিল করতে হয়েছে। অবস্থা ভালো না। মানুষ ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে। সিলেটে এ বছর বন্যা হয়েছে, আবার আন্দোলন এল। এসবের ধাক্কায় ধসই নেমেছে পর্যটন ব্যবসায়।”
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িতেও পর্যটনে ব্যাপক ধস মেনেছে। বর্ষায় সেখানকার লেক, পাহাড়, ঝরনা দুলে-ফুলে উঠলে তা দেখতে এবার ভিড় করেনি পর্যটকরা।
রাঙামাটির আবাসন ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, “পাহাড়ে আগের মতো পর্যটক আসছে না। আসলে দেশে যে অস্থিরতা চলছে, মানুষ ভালো নেই। ঘুরতে আসবে কীভাবে? সর্বশেষ এ রকম হয়েছিল কোভিডের সময়। সেই সময়ের মতো এখন এখানে বেশিরভাগ রিসোর্টই খালি।”
প্রায় ৪ হাজার ট্রাভেল এজেন্টের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এর সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ বলছেন, “ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। অভ্যন্তরীণ পর্যটন স্পটগুলো, যেমন- কক্সবাজার, সিলেট বা যেসব জায়গায় সাধারণত মানুষ যায়; সেখানে খুবই বাজে অবস্থা। মানুষ বের হচ্ছে না।
“৫ থেকে ১০ শতাংশ বুকিং রয়েছে এসব জায়গায়। ইন্টারনেট বন্ধ না থাকায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ সময়ে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ৩০ শতাংশ আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। তবে এই ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে সামনে।”
আবদুস আলাম বলেন, “ফ্লাইটগুলোও লসে অপারেট করছে। অফার দিয়েও মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে সব রুটের ফ্লাইটেই টিকিট খালি থাকছে।”
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, “এখন পরিস্থিতি ক্রমশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। আমরা বিদেশে আমাদের বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনে কথা বলেছি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের অনুরোধ করেছি, বাংলাদেশে ভ্রমণে আসার জন্য দেশগুলোর মানুষকে বলতে।
“আমাদের যিনি প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন, তার তো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা আছে। এটার পজেটিভ দিক আছে, আমরা তাকেও বলব। এরই মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চেয়েছি। আগামী রোববার সকালে এই খাতের অংশীজনদের নিয়ে আমরা একটা বৈঠক করব।”






































