
দেশে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদিত হয় বোরো মৌসুমে। খাদ্য নিরাপত্তা মূলত বোরো ফসলকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা। অন্যান্য মৌসুমে ধানের উৎপাদন হয় তুলনামূলক কম। আর বোরো মৌসুমের উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে রাসায়নিক সার ও সেচব্যবস্থার ওপর। তবে চলতি বছর বাজারে সারের আকাশছোঁয়া দামের কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক মাস আগে মৌসুমের শুরুতে সারের যে দাম ছিল, বর্তমানে তা প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক এলাকায় বেশি দাম দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। সরকার কৃষক পর্যায়ে সারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেই অনুযায়ী ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সারের দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা, মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ২০ টাকা এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের কোথাও সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতি কেজি সারে ৫ থেকে ১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে : ময়মনসিংহের ত্রিশালে কৃষক নুরুল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তিনি এক বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। নুরুল্লাহ জানান, যমুনা ব্র্যান্ডের ইউরিয়া সারের প্রতি কেজির দাম বর্তমানে ৩০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ২০ টাকা। চিকুন ইউরিয়ার দাম এক মাস আগে ছিল ৩০ টাকা, সেটি এখন কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এমওপি সারের দাম আগে ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। বর্তমানে তা ৫ টাকা বেড়ে ৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ডিএপি সারের দাম আগে ছিল ২৫ টাকা, এখন তা ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
নুরুল্লাহ বলেন, বাজারে সর্বত্র সারের সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। সময়মতো সার না পেলে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে প্রতি বিঘা জমিতে সাধারণত ৪৫ থেকে ৫০ মণ ধান উৎপাদন হয়। কিন্তু যথাসময়ে সার দিতে না পারলে ফলন তিন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সারের অতিরিক্ত দামে দিশাহারা কৃষক
কিশোরগঞ্জে সারের অতিরিক্ত দামে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে অন্তত ২ থেকে ৩ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে তাদের। অধিকাংশ কৃষক ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে খুচরা দোকান থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন; যেখানে কোনো রসিদও দেওয়া হয় না।
করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, একদিকে সারের দাম বেশি, অন্যদিকে ডিলার পর্যায়েও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। অনেক ডিলারের কাছে সার পাওয়া যায় না; বেশিরভাগ সার চলে যায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। ফলে কারা সার পাচ্ছেÑ কৃষকরা নাকি অন্য কেউ সুবিধা নিচ্ছেÑ এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সারের ডিলার আসলাম মিয়া বলেন, সরকার যে কমিশন দেয়, তা দিয়ে পরিবহন খরচ ও ক্ষতিগ্রস্ত (ড্যামেজ) সারের ব্যয়ও ঠিকমতো ওঠে না। ফলে অনেক সময় তাদের লোকসান গুনতে হয়।
সারের দামে তারতম্য, বিপাকে কৃষক
বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় সারের দামে তারতম্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন তারা।
খুলনার কয়রা উপজেলার কৃষক ইসরাফিল, সুধাকর ও প্রবীর জানান, মৌসুমের শুরুতে নির্ধারিত দামে সার কিনতে পারলেও এখন ইউরিয়া সারের জন্য প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৬ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রেও কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। শ্রমিক ও সেচ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ মৌসুমে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
পাইকগাছা উপজেলার কৃষক হাবিবুর ও দিনেশ জানান, তারা বাজার থেকে চিকন দানার ইউরিয়া সার প্রতি কেজি ৩৬ টাকায় কিনেছেন। অথচ অন্য বাজারে একই সার ৩৩ টাকায় পাওয়া গেছে।
বাড়তি খরচে লোকসানের শঙ্কা
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় এবার প্রায় ২৮,৬৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে ফসল পরিচর্যার সময় সার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। এখানে ইউরিয়া সার সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া গেলেও ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি— এই তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সার কিনতে গিয়ে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। খুচরা দোকানে ৫০ কেজির ‘বাংলা ডিএপি’বিক্রি হচ্ছে ১,৩০০ থেকে ১,৩৫০ টাকায়। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে আমদানি করা ‘ডিকে’ব্র্যান্ডের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১,৫০০ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী কৃষক পর্যায়ে ডিএপি বিক্রি হওয়ার কথা ১,০৫০ টাকা। এ ছাড়া এমওপি সার ১,০০০ টাকার পরিবর্তে ১,১২০ থেকে ১,১৫০ টাকায় এবং টিএসপি ১,৩৫০ টাকার পরিবর্তে ১,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মহাদেবপুরের কৃষক মোহাম্মদ আলী, যিনি দশ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, মৌসুমে তার ডিএপি, পটাশ ও ইউরিয়া সার প্রয়োজন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বস্তা। কিন্তু সার সংকটের কারণে ডিএপি বস্তাপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি খরচ করে কিনতে হচ্ছে। এতে মৌসুমের শুরুতেই সারসহ অন্যান্য উপকরণ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা।
সরকারি মূল্যে সার মিলছে না
পটুয়াখালীর গলাচিপায় কৃষকরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার কিনতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও খোলাবাজারে সরকারি দামে বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে কৃষকরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকরা জানান, বর্তমানে ডিলারের কাছে গেলে বস্তা ভেঙে খুচরা বিক্রি করা হচ্ছে না। খুচরায় ইউরিয়া বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩২ টাকা, টিএসপি ৩০-৩৫ টাকা, ডিএপি ২৫-৩০ টাকা এবং এমওপি ২৫-৩০ টাকা কেজিতে। এ ছাড়া চায়না ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ৩২-৩৫ টাকায়। অর্থাৎ কোনো সার ৩০ টাকার কম দামে পাওয়া যাচ্ছে না।
মৌসুমের শুরুতেও সারের তীব্র সংকট ছিল
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মৌসুমের শুরুতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।
উপজেলার সাচনা বাজার এলাকার বড় কৃষক সাত্তার বাদশা জানান, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে উপজেলায় ডিএপি ও ইউরিয়া সারের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। সে সময় ৫০ কেজির ইউরিয়া সারের বস্তা বিক্রি হয়েছে ১,৬০০ থেকে ১,৮০০ টাকায়, আর ডিএপি সারের দাম ছিল ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
বিএনপি নেতার কারসাজিতে ইউরিয়া সারের সংকট
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ বাফার গুদামে এক বিএনপি নেতার কারসাজির কারণে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় ইউরিয়া সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডিলাররা ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) করেও সময়মতো সার পাচ্ছেন না। ফলে ইরি-বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুই জেলার কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কালীগঞ্জের বিএনপি নেতা শাহজাহান আলী সিলেটের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে হ্যান্ডলিং ঠিকাদারির সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়েছেন। এরপর তিনি ইউরিয়া সার পরিবহনের খরচ— টনপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০ টাকা আদায় করছেন। সারের সরবরাহে এই অনিয়মের কারণে ইরি-বোরো মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুই জেলার কৃষকরা তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভে পড়েছেন।
মোবাইল কোর্টের কারণে বেশি দাম নেওয়ার পরিস্থিতি কমছে
সারে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় নেওয়া হচ্ছে— এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কৃষি মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিয়েছেÑ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখা) মো. খোরশেদ আলম জানান, যেখানেই বেশি দামের ঘটনা শোনা যাচ্ছে, সেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা খবর পেয়েছি, ডিলার পর্যায়ে এই প্রবণতা কমছে, তবে খুচরা পর্যায়ে এটি এখনও দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকার একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নতুন নীতিমালায় ডিলার ছাড়া কেউ সার বিক্রি করতে পারবে না। এতে বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার ঘটনা চিরতরে বন্ধ হবে।
খোরশেদ আলম বলেন, সরকারি গুদামে জুন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সার মজুদ আছে। কারণ ৬৪ জেলার মাসিক চাহিদা আগেই নির্ধারণ করা হয়। আমাদের কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের থেকে মুচলেকা নিচ্ছেন যে, আগামীতে এ ধরনের অনিয়ম করলে দ্বিগুণ শাস্তির মুখে পড়তে হবে। এই উদ্যোগের কারণে বাজারে বেশি দাম নেওয়ার প্রবণতা কমছে।




































