
শাহিন মিয়া (বিশেষ প্রতিনিধি):
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান সিলেট। প্রাচীনকালে যে জনপদ শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল, কালের বিবর্তনে সেই জনপদই আজকের সিলেট। আর এই সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক, ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নাম।
সিলেট নগরীর আম্বরখানা এলাকায় অবস্থিত তাঁর পবিত্র মাজার শুধু ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্র নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও মানুষের বিশ্বাসের এক অনন্য নিদর্শন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পর্যটক ছুটে আসেন এই পবিত্র দরগাহ জিয়ারত করতে।
শ্রীহট্ট থেকে সিলেট হওয়ার ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকেই বর্তমান সিলেট অঞ্চল শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, শ্রীহট্ট নামটি কালক্রমে শ্রীহট্ট, সিলহেট এবং পরবর্তীতে সিলেট নামে পরিচিতি লাভ করে। এই নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন শ্রীহট্ট জনপদের অস্তিত্বের কথা পাওয়া যায়।
চতুর্দশ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেটে আগমন এ অঞ্চলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর সফরসঙ্গী আউলিয়াদের নিয়ে সিলেটে আগমন করেন। সে সময় রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসনামলে সিলেট অঞ্চলে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে সিলেট অঞ্চলে ইসলামের প্রসারে হযরত শাহজালাল (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সিলেট জেলা প্রশাসনের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আজকের ঐতিহাসিক দরগাহ শরিফ।
দরগাহে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
দরগাহ শরিফের প্রধান ফটকে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল প্রবেশদ্বার। ফটকে লেখা রয়েছে ‘দরগাহ-এ-হযরত শাহজালাল (রহ.)’। ফটকের দুই পাশে শোভা পাচ্ছে ‘আল্লাহু’ ও ‘মুহাম্মদ’ লেখা।
ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির একটি মসজিদ। মসজিদের দুই পাশে রয়েছে মুসল্লিদের অজু করার সুব্যবস্থা। মসজিদকে ঘিরে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে এক ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
মসজিদের নিচের অংশে রয়েছে চারটি বড় খেজুরগাছ। গাছগুলো দেখতে অনেকটা আরবের পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। এসব গাছের নিচে বসে থাকতে দেখা যায় বিভিন্ন দরবেশ, ফকির ও ভক্তদের
সংরক্ষিত রয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শন
খেজুরগাছের পাশেই রয়েছে মোয়াজ্জেম বাড়ি।
সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে পরিচিত একটি তলোয়ার, যার আকৃতি দেখতে অনেকটা ঐতিহাসিক জুলফিকারের মতো। পাশাপাশি রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত বলে পরিচিত এক জোড়া সোনালি খড়ম।
এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। তবে এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক পরিচয় ও সংরক্ষণ-সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
জালালী কবুতর, মহিলাদের নামাজের স্থান ও লঙ্গরখানা
প্রধান ফটকের ডান পাশে রয়েছে দরগাহ অফিস। এর পাশেই রয়েছে বিখ্যাত জালালী কবুতরদের খাবার দেওয়ার স্থান। কবুতরগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল আবাসস্থল। দরগাহের অন্যতম আকর্ষণ এই জালালী কবুতর।
এর পাশেই রয়েছে মহিলাদের নামাজ আদায়ের স্থান। সেখানে মা-বোনেরা নামাজ আদায় করেন।
আরও সামনে গেলে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির তিনটি শিন্নির ডেগ। ভক্তরা এখানে বিভিন্ন ধরনের মানত ও দান করে থাকেন। দরগাহ এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়।
এ ছাড়া রয়েছে লঙ্গরখানা, যেখানে অসংখ্য মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানুষের সেবা ও খাবার বিতরণের এই ব্যবস্থাও দরগাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পুকুরে মাছ ও কচ্ছপের বিচরণ
দরগাহের ভেতরের দিকে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরে অসংখ্য গজার মাছ ও কচ্ছপের বিচরণ দেখা যায়। দর্শনার্থীদের কেউ মাছকে খাবার দিচ্ছেন, কেউ আবার পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে মাছের চলাচল উপভোগ করছেন।
পুকুরের চারপাশে রয়েছে গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, যা দর্শনার্থীদের মনে আলাদা প্রশান্তি এনে দেয়।
কূপ, মাজার ও ঐতিহাসিক কবরস্থান
পুকুরের পাশ দিয়ে একটি ছোট ফটক দিয়ে বের হলে দেখা যায় হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে পরিচিত ঐতিহাসিক কূপ। কূপটির পানি অনেক ভক্ত পান করেন এবং অনেকে মানতও করেন। কূপের আগে রয়েছে মজু শাহের মাজার।
এরপর চোখে পড়ে বিশাল কবরস্থান। এখানে অসংখ্য মানুষের কবর রয়েছে। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের কাছে স্থানটি গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
কবরস্থান ঘুরে আরেকটি ছোট ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে মূল মাজারের দিকে যাওয়ার পথ পাওয়া যায়।
মূল মাজারের অভ্যন্তরে এক ঐতিহাসিক পরিবেশ
মূল মাজারে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে রাজকীয় আকৃতির একটি সিঁড়ি। সিঁড়ির বাম পাশে রয়েছে মসজিদ। এর সামনে খাদেমদের ইবাদতখানা এবং একটি বড় দানবাক্স রয়েছে।
সামনের দিকে রয়েছে কয়েকটি ঐতিহাসিক সমাধি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে শায়িত রয়েছেন—
১. হাজী উল-হারামাইন হযরত শেখ হাজী মোহাম্মদ ইউসুফ, যাঁকে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ভগ্নিপুত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।
২. হাজী হযরত পীর দরিয়া।
৩. হযরত হাজী খলিল।
৪. সরেক ওম আবু তোরাব আব্দুল ওয়াহাব।
এরপরই রয়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মূল মাজার। লাল-সবুজের সাতটি সামিয়ানার নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহান সুফি সাধক।
মাজারের ডান পাশে শায়িত রয়েছেন ইয়েমেনের শাহজাদা শেখ আলী এবং বাম পাশে রয়েছেন সিলেটের শাসনকর্তা হিসেবে পরিচিত মকবুল খান।
মাজারের অভ্যন্তরে রয়েছে অসংখ্য পবিত্র কোরআন শরিফ এবং তিন গম্বুজবিশিষ্ট নামাজ আদায়ের স্থান। পাশাপাশি রয়েছে একটি বড় দানবাক্স, যা আনসার সদস্যদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।
বর্তমান সিলেটে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন সবকিছু মিলিয়ে হযরত শাহজালাল।
























