
শাহিন মিয়া (অষ্টগ্রাম )
হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে আবারও হাজার হাজার একর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পানি কোনো পাহাড়ি ঢল বা নদীর প্লাবন নয়; এটি মূলত বৃষ্টির পানি, যা বের হতে না পেরে হাওরের ভেতরেই আটকে আছে। এর ফলে অগণিত কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বছরের একমাত্র ফসল।
এই পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে, যা আমরা বারবার উপেক্ষা করছি। অকাল বন্যা প্রতিরোধের জন্য যে বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো মূলত নদীর ঢল ঠেকানোর জন্য পরিকল্পিত। কিন্তু এসব বাঁধ নির্মাণের সময় হাওরের ভেতরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে বাঁধগুলো অনেক ক্ষেত্রে আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাঁধের ভেতরের কৃষিজমিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে দিনের পর দিন। পর্যাপ্ত স্লুইস গেট, আউটলেট কিংবা নিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে সেই পানি বের হতে পারছে না। ফলে ধান পাকতে না পেরে আগেই তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কখনো কখনো অবৈধভাবে বাঁধ কাটেন, যা আবার বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
এখানে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি নদীর পানি আটকাতে গিয়ে নিজের বৃষ্টির পানিকেই শত্রু বানিয়ে ফেলছি? যদি তাই হয়, তবে এই বাঁধ ব্যবস্থাপনা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সমাধান একমাত্রিক নয়। শুধু আরও বাঁধ নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বাঁধের নকশা পুনর্মূল্যায়ন, যাতে প্রতিটি বাঁধে পর্যাপ্ত ও কার্যকর স্লুইস গেট থাকে এবং বৃষ্টির পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বের হতে পারে। পাশাপাশি বাঁধ পরিচালনায় স্থানীয় কৃষকদের যুক্ত করা জরুরি, কারণ মাঠের বাস্তবতা তারাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
এ ছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করার ব্যবস্থা রাখা দরকার, যাতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অবৈধ উপায়ে বাঁধ কাটতে না যান। আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস অনুযায়ী আগাম ধান কাটার ব্যবস্থা এবং যান্ত্রিক হার্ভেস্টিং সহায়তাও ক্ষতি কমাতে পারে।
হাওরাঞ্চল, বিশেষ করে হাওর অঞ্চল, একটি সংবেদনশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এখানে উন্নয়ন মানেই শুধু বাঁধ নয়; উন্নয়ন মানে হলো পানি চলাচলের পথ বুঝে, প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা করা। নদী খনন, হাওর সংরক্ষণ, পানি ধারণ এলাকা সৃষ্টি এবং সড়ক–বাঁধ–স্লুইসকে একসাথে বিবেচনায় এনে একটি সমন্বিত হাওর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অকাল বন্যা প্রতিরোধের নামে যদি প্রতি বছর কৃষকের ধানই ডুবে যায়, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বেই। এখনই সময়—বাঁধকে শত্রু নয়, কিন্তু বাঁধ ব্যবস্থাপনাকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিকভাবে নতুন করে ভাবার।




























