
দীর্ঘ ১১ মাসের লড়াই-সংঘাতের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। গত ৮ ডিসেম্বর মংডু টাউনশিপের দক্ষিণে বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সর্বশেষ ৫ নম্বর সীমান্ত ব্যাটালিয়ন দখলে নেয় তারা।
মিয়ানমারের দৈনিক ইরাবতীর খবরে বলা হয়, মংডুর দখল করা সর্বশেষ ঘাঁটি থেকে কুখ্যাত সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরিন তুনসহ জান্তা বাহিনীর কয়েকশ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আরাকান আর্মি।
দৈনিক ইরাবতী জানায়, গত বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালায় আরাকান আর্মি। এরপর রাজ্যটিতে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয়।
গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আরাকান আর্মি বলেছে, মংডুর পুরো এলাকার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তারা।
মংডু আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে দুই পারেই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে। রাখাইন রাজ্যে ৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে এখনো। তাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির বিরোধ আছে। রাখাইনের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে বান্দরবান ও কক্সবাজার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কোস্ট গার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
মংডু দখলে নেয়ার পরপরই আরাকান আর্মি নাফ নদীতে নৌ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ৫ দিন ধরে নৌ চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনে খাদ্যসামগ্রীর মজুত কমে গেছে। মিয়ানমার থেকে আমদানি পণ্যবোঝাই জাহাজ বা কার্গো ট্রলার টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারছে না।
বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটি’র সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, মংডু টাউন রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় দুই পারের (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাজ্যটি শেষ পর্যন্ত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থেকে গেলে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন থেমে যাবে। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যের বসবাসকারী আরো ৫ লাখ রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। কারণ, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির বিরোধ আছে।
মিয়ানমারের মংডুর সঙ্গে বাংলাদেশের ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। নাফ নদীটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমানা ভাগ করে রেখেছে। রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে বাংলাদেশের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফ-উখিয়া হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত ২৭০ কিলোমিটারে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বাংলাদেশ। টেকনাফ, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে নাফ নদীর বাংলাদেশ জলসীমায় টহল দিচ্ছে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্তে কঠোর অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের কাউকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।
আরআরআরসি কার্যালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে। গত ৭ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের পুলিশ সুপার আল আসাদ মোহাম্মদ মাহফুজ ইসলাম বলেন, জাহাজে পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য একাধিক পুলিশ সদস্য রাখা হচ্ছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণের সময়ও সার্বক্ষণিক ট্যুরিস্ট পুলিশ নিরাপত্তা দিচ্ছে। রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মির দখলে যাওয়ার পর সেন্টমার্টিন ভ্রমণে এখনো তেমন ঝুঁকি তৈরি হয়নি।







































