
সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার
পহেলা বৈশাখ কেবল একটি নববর্ষের সূচনা নয়; এটি বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য, জীবনচর্চা এবং আত্মপরিচয়ের এক অনন্য সম্মিলন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এক জনগোষ্ঠী, যার শেকড় বাঙালিয়ানায় প্রোথিত এবং যার পরিচয় আজ বাংলাদেশের মানচিত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
বাংলা সনের উৎপত্তি কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রয়োজনে হলেও, সময়ের প্রবাহে এটি পরিণত হয়েছে একটি সর্বজনীন জাতীয় সংস্কৃতির প্রতীকে। মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের উদ্যোগে প্রবর্তিত এই পঞ্জিকা আজ আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষকের পরিশ্রম, ঋতুচক্রের আবর্তন এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান—এসবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বৈশাখের মৌলিক ভিত্তি।
বৈশাখের প্রধান শক্তি নিহিত রয়েছে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনায়। এখানে ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে এক বৃহত্তর ঐক্যের বোধ। এই উৎসব আমাদের শেখায়—বাংলাদেশি পরিচয় বিভাজনের নয়; বরং এটি সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত ঐক্যের প্রতীক।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলা থেকে শুরু করে শহরের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা—সবখানেই বৈশাখ বয়ে আনে প্রাণের উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা। লোকজ ঐতিহ্য, শিল্প, সংগীত এবং নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বাঙালির সাংস্কৃতিক গভীরতা ও বৈচিত্র্য। এই উৎসব আমাদের অতীতকে ধারণ করে, বর্তমানকে শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গঠনে অনুপ্রেরণা জোগায়।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি মূলত বাঙালিয়ানার ধারাবাহিক বিকাশ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। এই সংস্কৃতি যেমন ঐতিহ্যের ধারক, তেমনি একটি স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিফলন। তাই বাঙালি পরিচয় ও বাংলাদেশি জাতীয়তা—দুটি একে অপরের পরিপূরক, বিরোধী নয়; বরং একটি অপরটির শক্তিকে দৃঢ় করে।
বিশ্বের দরবারে একটি মর্যাদাবান জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাদের এই বৈচিত্র্যের মধ্যকার ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। বৈশাখ সেই শক্তির উৎস, যেখানে আমরা আমাদের শেকড়কে ধারণ করে একটি প্রগতিশীল, আত্মবিশ্বাসী ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
অতএব, পহেলা বৈশাখ কেবল আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করে, আমাদের ঐক্যের ভিত্তিকে দৃঢ় করে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা বৈচিত্র্যময় হলেও ঐক্যবদ্ধ, আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি, এবং আমরা এক অবিচ্ছেদ্য জাতিসত্তার অংশ।
এই চেতনাই হোক আমাদের অগ্রযাত্রার প্রেরণা—একটি ঐক্যবদ্ধ, সংস্কৃতিমনা ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার।





























