
শীত ও বসন্ত পার হয়ে গ্রীষ্ম ছুই ছুই।মৌসুম পরিবর্তনের সাথে সাথে বাড়ছে তাপমাত্রা। আর তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারাদেশের মতো গাজীপুর মহানগরেও বাড়ছে মশার উপদ্রব। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, অফিস-আদালত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সর্বত্রই মশার রাজত্বে দিশেহারা নগরবাসী। মশা নিধনে ওষুধ না ছিটানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে মশার ঘনত্ব বেড়েছে বহুগুণ। শিল্পনগরী অধ্যুষিত গাজীপুর মহানগর যেন এখন মশার নগরীতে পরিণত হয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় নেই পর্যাপ্ত নালা, নেই ময়লা আবর্জনা ফেলার যথাযথ স্থান। যে যেখানে পারছেন সেখানেই বাসা-বাড়ি ও ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের ময়লা আবর্জনা ফেলছেন। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এসব স্থানে জমে থাকা পানি থেকে জন্ম নিচ্ছে মশা। মশার উপদ্রব এতোটাই বেড়েছে যে অনেকেই দিনের বেলাতেও ঘরে মশারি টানিয়ে রাখছেন।
কর্মব্যস্ত এ শহরে পবিত্র রমজানে সেহরি কি ইফতার সবসময়ই মশার যন্ত্রনায় অসহ্য হয়ে উঠেছেন নগরবাসী। এদিকে মশার উপদ্রব বাড়লেও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নিধনে নেই কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।
গাজীপুর মহানগরবাসীর অভিযোগ, মশা নিধনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতায় মশারা যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গ্রিন ও ক্লিন সিটি গড়ার প্রতিশ্রুতি যেন শুধু আশ্বাসেই আটকে আছে। উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও গরম ছাপিয়ে মশার উপদ্রব এখন নগরবাসীর জন্য ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে। জলাশয়গুলো মশার প্রজননের নিরাপদ ও উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসী দিনে যেমন মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ, তেমনি সন্ধ্যার পর পুরো নগরী মশার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। কয়েল জ্বালিয়ে, মশারি টানিয়ে, ইলেকট্রিক ব্যাট বা ওষুধ স্প্রে করে কোনোভাবেই মশার আক্রমণ প্রতিহত করা যাচ্ছে না।কর্তৃপক্ষের টনক যেন কোনভাবেই নড়ে না।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন সূত্র জানা যায়, নগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে মশক নিধনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির শতাধিক ফগার মেশিন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভেহিকল মাউন্টেন ফগার মেশিন রয়েছে। রয়েছে পোল্যান্ডের তৈরি ডেন্টাসাইড ২৫০ নামক মশার ওষুধ। কিন্তু এখনো নগরীতে মশকবিরোধী জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
মহানগরীর বারেন্ডা এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ বাশার বলেন, "মশা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। মশার যন্ত্রণায় ঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখা যায় না। বাচ্চারা পড়তে বসে মশার কামড়ে অস্থির হয়ে যায়। দিনের বেলায়ও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যার পর ঘরে থাকা যায় না। মশা যেখানে কামড়ায়, সেখানে যন্ত্রণা করে, লালচে হয়ে যায়।"
কোনাবাড়ি এলাকার দোকানদার রতন বলেন, "আমাদের এলাকায় অনেক মশা। সরকারি কোয়ার্টারে মশার ওষুধ ছিটানো হয় দেখছি, কিন্তু আমাদের এলাকায় দেয় না। রাত-দিন সারাক্ষণ গরম ও মশার কামড়ে জীবন অতিষ্ঠ।"
জরুন এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক চুমকি খাতুন বলেন, "আমাদের এখানে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখা যায় না। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, যেন দ্রুত আমাদের এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হয়। মশা অনেক বেড়ে গেছে। দিনে ঘুমাতে গেলে বা সন্ধ্যার পর থেকে মশারি টাঙিয়ে রাখতে হয়। মশার সমস্যা খুবই জটিল হয়ে পড়েছে।সারাদিন অফিস করে এসে বাসায় মশার যন্ত্রনায় শান্তিতে থাকতে পারি না।"
এ নিয়ে কথা হলে গাজীপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন মাহমুদা আক্তার জানান, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় আবদ্ধ জলাশয়, নালা ও ময়লার স্তূপ রয়েছে। শীতের শেষে সামান্য বৃষ্টি হওয়ার পর এসব স্থানে মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তাপমাত্রা বাড়ায় এসব স্থানে যে মশার ডিম ছিল, সেগুলো থেকে মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে।
মশা নিধনে সিটি করপোরেশনকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গাজীপুর নাগরিক ফোরামের সভাপতি জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, "মশা মারার ওষুধ ছিটানো, বিভিন্ন জলাশয়, নর্দমা ও ডোবা পরিষ্কার করা—এসব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সেই সঙ্গে যেসব জলাশয় আছে, সেসব স্থানে লার্ভিসাইড, অ্যাডাল্টিসাইট কিংবা গাপ্পি মাছ ছাড়তে হবে।"
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এস এম শফিউল আজম বলেন, "নাগরিকদের এসব সমস্যার বিষয়ে আমরা সচেতন। বিভিন্ন সময়ে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, নানা পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। মশকনিধনে নাগরিকদের আরও সচেতন করতে কাজ চলছে।"





























