
পার্শ্ববর্তী নির্মাণস্থলে ইট ভাঙার বিকট শব্দে টানা নির্ঘুম দুই রাত কাটানোর পর ৯৯৯ নম্বরে কল করেন রোমেনা আহমেদ। স্বস্তি পেতে রাতের কাজ বন্ধ রাখতে পুলিশকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান তিনি। পুলিশ তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ায় নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ওই ঠিকাদার। তবে রোমেনা যে সমাধানটি পেয়েছেন, তা সবসময় পাওয়া সহজ নয়। কারণ, অনেকে নিশ্চিত নন যে, একই পরিস্থিতিতে পুলিশের সহায়তা পাওয়া যাবে কি-না।
নগরীতে বাড়ছে শব্দদূষণ
গত বছর (২০২৪) তৃতীয়বারের মতো ঢাকা সফর করা কানাডিয়ান বিল ম্যাকলেইন তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “ঢাকায় কোলাহল অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ বার রাস্তায় চলাচলের সময় শব্দ আটকাতে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করতে হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় পা রাখলে প্রায়ই মনে হয় যেন গাড়ির হর্নের শব্দের শহরে ঢুকে পড়া। গাড়ির চালকরা সবচেয়ে জোরে শব্দ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। মাত্র এক সেকেন্ড দেরি হলে কান ফাটানো হর্ন বাজানো শুরু হতে থাকে।”
বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণ ক্ষেত্রগুলোর অবিরাম খটখট শব্দ। ধাতব বস্তু কাটার শব্দ, ইট ভাঙার শব্দ এবং জেনারেটরের শব্দ। এই শহরে উচ্চ শব্দের যেন কোনো লাগাম নেই। এমতাবস্থায় শহরে শান্তি বিরল হয়ে উঠেছে।
মালিবাগের বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, “এখন তো রাস্তার বিক্রেতারাও পণ্য বিক্রি করতে লাউডস্পিকার ব্যবহার করছে। এটা সহনীয় নয়, এসব বন্ধ করতে হবে।”
২০১৭ সালে বাংলাদেশে মোটরযানে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে উচ্চ আদালত। কারণ এটি ১২০ ডেসিবলের আকারে পৌঁছতে পারে এবং ৬০ সেকেন্ডেরও বেশি সময় ধরে এই স্তরের সংস্পর্শে থাকলে তাৎক্ষণিক আঘাত এবং শ্রবণশক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাস্তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকার হাইকোর্টের নির্দেশনা ভুলে গেছে এবং ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী অধিকাংশ যানবাহন এখনো তা ব্যবহার করছে।
মাসুদ নামে এক চাকরিজীবী বলেন, “অফিসে পৌঁছানোর জন্য গণপরিবহন পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু, রাস্তায় বিভিন্ন যানবাহনের হর্নের কারণে অপেক্ষার সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”
শব্দদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ৬৫ ডেসিবল (ডিবি) এর ওপরে শব্দের মাত্রা দূষণ হিসাবে বিবেচিত হয়। যার মধ্যে ৭৫ ডিবি ক্ষতিকারক এবং ১২০ ডিবি সরাসরি যন্ত্রণাদায়ক। ২০১৮ সালে ডব্লিউএইচও স্বাস্থ্যগত কারণে ট্র্যাফিক শব্দকে ৫৩ ডিবিতে সীমাবদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল।
বাংলাদেশে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, নীরব এলাকায় গ্রহণযোগ্য শব্দসীমা দিনের বেলায় ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবল। আবাসিক এলাকায় দিনের জন্য ৫৫ ডিবি এবং রাতের জন্য ৪৫ ডিবি। মিশ্র অঞ্চলে দিনের জন্য ৬০ ডিবি এবং রাতের জন্য ৫০ ডিবি। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের জন্য ৭০ ডিবি এবং রাতের জন্য ৬০ ডিবি এবং শিল্পাঞ্চলে দিনের জন্য ৭৫ ডিবি এবং রাতের জন্য ৭০ ডিবি।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা অতিক্রম করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু, ঢাকার বাসিন্দারা প্রতিদিন বাসাবাড়িতে, কর্মস্থলে, স্কুল এমনকি হাসপাতালগুলোতে বিপজ্জনক মাত্রার শব্দের সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা অপরিবর্তনীয় শব্দ-প্ররোচিত শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং অতিরিক্ত শব্দ দীর্ঘ সময় উৎপন্নের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফ্রন্টিয়ার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “শব্দ দূষণ শহুরে বন্যজীবনকেও ব্যাহত করে, পাখি, ব্যাঙ এবং পোকামাকড়ের মধ্যে যোগাযোগকে প্রভাবিত করে এবং তাদের বেঁচে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ।”
প্রতিবেদনে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। শুধুমাত্র ইউরোপে, দীর্ঘ সময় ধরে উৎপন্ন শব্দের কারণে বছরে ১২ হাজার অকাল মৃত্যু এবং ৪৮ হাজার নতুন ইসকেমিক হৃদরোগের জন্য দায়ী।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ চেষ্টা
শব্দদূষণ রোধে গত বছরের ১ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের ৩ কিলোমিটার এলাকাকে “নীরব এলাকা” ঘোষণা করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা। আইন অমান্যকারীদের ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হতে পারে। এটি গেল ডিসেম্বর থেকে কঠোরভাবে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এই নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানটি কার্যকর করার দায়িত্বে রয়েছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “প্রাথমিকভাবে এই উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং পরে পুরো ঢাকা শহরে এটি বিস্তৃত করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহরগুলোকেও শব্দদূষণ রোধে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”
নীরব অঞ্চল: এখনও দেখেনি আলোর মুখ
সচিবালয়, আগারগাঁও এবং সংসদের মতো নীরব অঞ্চলগুলোর পূর্ববর্তী ঘোষণা সত্ত্বেও কোনো উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ পাওয়া যায়নি। সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (সিএপিএস) একটি গবেষণায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ঢাকার ১০টি স্থানে শব্দের মাত্রা নিয়ে বছরব্যাপী গবেষণা চালিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপ করা সমস্ত অঞ্চলে শব্দ গ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছে। বিশেষত, নীরব এলাকায় ৯৬.৭%, আবাসিক এলাকায় ৯১.২%, মিশ্র-ব্যবহারের এলাকায় ৮৩.২%, বাণিজ্যিক অঞ্চলে ৬১% এবং শিল্প অঞ্চলে ১৮.২% শব্দের মাত্রা মানসীমা ছাড়িয়ে গেছে।
সচিবালয় এলাকায় শব্দের মাত্রা গড়ে ৭৯.৫ ডেসিবল, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান বলেন, “হর্ন বাজানো বন্ধ করতে পারলে ঢাকার শব্দদূষণ ৬০% কমাতে পারব।” তিনি এ সমস্যা কার্যকরভাবে রোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও জনগণের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আগামীর করণীয়
সরকার ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে ঢাকার আরও ১০টি সড়ককে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা করেছে। তাই বিশ্বের অন্যতম কোলাহলপূর্ণ শহরটিতে শব্দ দূষণ কমার আশা করা হচ্ছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সম্প্রতি বলেছেন, “শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে, যা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ক্ষমতা দেবে।”
তিনি কেবল জরিমানা এবং কারাদণ্ডের চেয়ে আরও বেশি কিছু করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জনসচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই মূল বিষয়।”
উপদেষ্টা বলেন, “মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন করতে সময় লাগবে, তবে যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা হর্ন বাজানো উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি।”
তিনি জরিমানা আরোপের আগে চালক এবং সাধারণ জনগণ উভয়কেই প্রশিক্ষিত করার গুরুত্বের উপর জোর দেন। শব্দ দূষণের বিষয়ে জনসাধারণের আচরণে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা।







































