
মোঃ আল আমিন, জেলা প্রতিনিধিকিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে পিরিজপুর ইউনিয়নের বিলপাড়ে অবস্থিত 'মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র'র বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পিকনিক-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) দিনভর শতাধিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও স্থানীয় শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আনন্দ আয়োজনে প্রতিবন্ধী শিশুরা নানা কসরত দেখায়। মানবিক ও ব্যতিক্রমধর্মী এ আয়োজনে ছিল শিশুদের জন্য বয়স ও উপযোগিতাভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ এবং সম্মিলিত পিকনিক। শিশুশিক্ষার্থী বাদে অভিভাবকরাও এতে অংশ নেন। মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক কালের কণ্ঠের হাওরাঞ্চলের নিজস্ব প্রতিবেদক ও মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাসরুল আনোয়ার। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে হায়াত আফসানা, সিনিয়র শিক্ষক রেখা আক্তার, ঝুমুর আক্তার, নাহিদা পারভীন, সহকারী শিক্ষক এহুদা আক্তার, সুরমা বেগম, ইভা আক্তারসহ বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী নাসরুল আনোয়ার বলেন, 'প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্রীড়া নৈপুণ্য বিমোহিত করেছে। আবার এক অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর অনুভূতিও জেগেছে। এরা যেন এক-একটি দেবশিশু। ওরা মুখ খুলে যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু যে ভাষায় বলে তা এক সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারুর বোঝার উপায় নেই'। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে হায়াত আফসানা আলোকিত সকালকে জানান, প্রতিবন্ধী শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির লক্ষ্যেই প্রতিবছরের মতো এবারও এ আয়োজন করা হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে ছোট ছেলে-মেয়ে ও বড় ছেলে-মেয়েদের জন্য পৃথকভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল দৌড়, আলু কুড়ানো, বল খেলা, স্মৃতি পরীক্ষা, চেয়ার খেলা, দড়ি লাফ, বালিশ উপাদান, পুরস্কার পাড়া ও অন্যান্য অংশগ্রহণমূলক খেলা। পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ খেলার আয়োজন করা হয়, যা অনুষ্ঠানে বাড়তি উৎসবমুখরতা যোগ করে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার হাতে পেয়ে শিশুদের মুখে ফুটে ওঠে নির্মল হাসি ও আনন্দের ঝলক। অভিভাবকরা সন্তানদের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হন এবং উপস্থিত অতিথি ও শিক্ষকবৃন্দ শিশুদের উৎসাহিত করেন। অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এ পর্বে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বন্যা আক্তার গান পরিবেশন করে উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ান। এছাড়া হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থী মোঃ বরকতুল ইসলাম গান পরিবেশন করে তার প্রতিভা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু মোহনার নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও আবেগঘন করে তোলে। অভিভাবকদের মধ্য থেকেও অটিজম শিশুর অভিভাবক রিতা আক্তার গান পরিবেশন করেন; যা অনুষ্ঠানে পারিবারিক সম্পৃক্ততা ও আনন্দের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পিকনিক। আয়োজকরা জানান, পিকনিক উপলক্ষে খাসি জবাই করে প্রতিবন্ধী শিশু, অভিভাবক, অতিথি ও সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য তেহারি পরিবেশন করা হয়। এ আয়োজনকে ঘিরে শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। পিকনিক কমিটির পক্ষ থেকে খাবার পরিবেশন করেন অখিল নমদাস, আবু সিদ্দিক, বন্যা আক্তার ও জবা আক্তার। রান্নার দায়িত্বে ছিলেন সেবা ডেকোরেটর-এর প্রতিনিধি মো. মুর্শিদ ভূঁইয়া। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিকনিক কমিটির সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ খাবার রান্না ও পরিবেশন করেন- যা অনুষ্ঠানের মানবিক সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। আয়োজকরা আরও জানান, অনুষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন ডা. তৌফিক হাসান শাহ চৌধুরী। এছাড়া অবশিষ্ট ব্যয়ভার বহন করে মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। আয়োজকরা এ সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, পুনর্বাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মহলের সহযোগিতা কামনা করেন। মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া জানান, এ ধরনের আয়োজন প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শুধু বিনোদনের সুযোগই তৈরি করে না বরং তাদের সামাজিকীকরণ, পারিবারিক সম্পৃক্ততা, মানসিক সুস্থতা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং মূলধারার সমাজের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এমন আয়োজন প্রতিবন্ধী শিশুদের আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মূলধারার সমাজে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক, অনুকরণীয় ও মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।































