
টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনীতির চরম এক দুঃসময়ে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর আগে সবশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। সে সময় দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও ছিল সাড়ে ৫০০ ডলারের কাছাকাছি। এর প্রায় ২০ বছর পর জাতীয় সংসদে বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
এবারের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ কোটি টাকার মতো। অবশ্য এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়। বর্তমানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ দশমিক ৩৯ লাখ টাকা)। এই মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা কাটিয়ে এখানে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসাবাণিজ্যে অস্থিরতা ও মন্দাবস্থা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। নিত্যপণ্যের বাজারে অরাজকতা বন্ধ করা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। এত সব অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে একটি স্বস্তিদায়ক বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
আগামী বাজেট হবে বিএনপি সরকারের জন্য ১৫তম বাজেট। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। রাজনৈতিক, বৈশ্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবারের বাজেটকে ইতিহাসের সেরা বাজেট হিসেবে প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে বাজেটের ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে অগ্রাধিকার পাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকট সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে।
সরকার ও দেশবাসীকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে জ্বালানি খাত। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে সরকারও। এজন্য রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। অন্যদিকে শর্ত পরিপালন করতে না পারায় ঋণের কিস্তি আটকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। যার ফলে সরকারে ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট ও বৈদেশিক মুদ্রা খাতে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে কোনো পরিকল্পনাতে স্থিরও থাকতে পারছে না সরকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি। রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক নেতিবাচকতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এজন্য বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। গত কয়েক বছর থেকে বাজেটে একধরনের রক্ষণাত্মক ও সংকোচনমুখী নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।
২০ বছর পর বিএনপি সরকারের জন্য এটি প্রথম বাজেট হওয়ায় রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। এ ছাড়া জনপ্রত্যাশা রয়েছে আরও বেশি। অবশ্য সব প্রত্যাশা ও চাপকে ছাপিয়ে গেছে এবারের বৈশ্বিক সংকট। যার ফলে সংকোচন নাকি সম্প্রসারণমুখী বাজেট দেবেন অর্থমন্ত্রী তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা বলছেন, তারা রেগুলার কাজগুলো করে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক চাহিদাগুলো এখনো একত্র করা হচ্ছে। এজন্য ২০ এপ্রিল বাজেট পরিপত্র-২ জারি করা হয়েছে। সেখানে তিন বছর মেয়াদি বাজেট পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য দ্বার উন্মোচন করার মতো বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, সেখানে বাজেটের প্রাথমিক আকার, জিডিপির প্রাক্কলন, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি, জ্বালানি সংকটের আশু সমাধানকল্পে নির্দেশনা দিয়েছেন।
শুধু তা-ই নয় বাজেটকে জনমুখী ও জনকল্যাণকর করতে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখাতে বলেছেন আসছে বাজেটে। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংসস্থানে গতি ফেরাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, বহিঃখাত থেকে অর্থায়ন এনে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রতি। মানুষকে কষ্ট না দিয়ে, হয়রানি না করে বেশিসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। যেসব খাত এখনো অপ্রস্ফুটিত রয়েছে সেগুলোকে রাজস্ব আয়ের নতুন নতুন খাত হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে রাজস্ব খাতের আওতা বাড়াতে হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। আপনি যদি দেশের গ্রোথ চান, বিনিয়োগ চান, তাহলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘আন্ডার পারফর্ম’ করছে এবং কর্মসংস্থানও কমছে।
আমরা এসব জায়গায় অ্যাড্রেস করব আমাদের বাজেটে। ব্যবসাবাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এজন্য আমরা ব্যবসাবাণিজ্য সহায়ক নীতি অবলম্বন করতে চাই।
সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করছে সরকার। তবে এটা এখনো চূড়ান্ত নয়। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ থেকে ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো হতে পারে। আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হতে পারে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাজেট আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব আলোচনায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যালোচনাও করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে একটা স্বস্তিকর বাজেট ঘোষণা করা। কেননা এ সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা আকাশসম।




































