
সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণায় উঠে এসেছে হাড় হিম করা তথ্য: দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮ শতাংশ এখন মাদকের জালে বন্দি। যার সিংহভাগই তরুণ সমাজ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইন থেকে শুরু করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কিংবা ফার্মগেটের ফুটওভার ব্রিজ সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় হাঁটলে মনে হবে আপনি কোনো হরর মুভির সেটে ঢুকে পড়েছেন। নির্জীব চোখের দৃষ্টি, কঙ্কালসার দেহ আর অসংলগ্ন আচরণ নিয়ে ড্রেন বা ফুটপাতে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে আঁতকে ওঠেন পথচারীরা। দেখতে অনেকটা জম্বিদের মত। এই মানুষগুলোই মাদকের নেশায় হারিয়ে ফেলছে নিজেদের অস্তিত্ব।
সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণায় উঠে এসেছে হাড় হিম করা তথ্য, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮ শতাংশ এখন মাদকের জালে বন্দি। যার সিংহভাগই তরুণ সমাজ।
রাজধানীর ফুটপাত বা পার্কে দিনের বেলা যারা জম্বির মতো পড়ে থাকে, অন্ধকার নামলেই তাদের রূপ বদলে যায়। নেশার টাকার জোগাড় করতে এরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায়। ঢাকার অলিগলিতে এখন সাধারণ মানুষের চলাচল দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শুধু ঢাকা বিভাগেই মাদকসেবীর সংখ্যা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (BMU) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকের হাতে খড়ি হচ্ছে খুব অল্প বয়সে।৩৩ শতাংশ সেবনকারী ৮-১৭ বছর বয়সেই প্রথম নেশার স্বাদ নেয়। ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮-২৫ বছর বয়সে। অর্থাৎ, একটি প্রজন্ম তাদের সৃজনশীল সময়ের পুরোটা ঢেলে দিচ্ছে মাদকের নীল দংশনে। গবেষণায় সিগারেটকে মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করা সত্ত্বেও এই সংখ্যা ৮২ লাখে পৌঁছেছে।
মাদকসেবীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে গাঁজা (৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন)। এরপরই আছে মরণঘাতী ইয়াবা (২২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৫ জন) এবং অ্যালকোহল। তবে নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে ইনজেকশন, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এবং এলএসডি। গবেষণার তথ্যমতে, একজন মাদকসেবী মাসে গড়ে ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেন।
প্রায় ৯০ শতাংশ সেবনকারী জানিয়েছেন, মাদক এখন অত্যন্ত সহজলভ্য। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীরা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। মাদক ছাড়ার আকুতি থাকলেও সুযোগ নেই চিকিৎসার।
বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম সতর্ক করে বলেছেন, "এটা ভাবার কারণ নেই যে শুধু কিছু খারাপ মানুষ মাদকাসক্ত। আমাদের সন্তানরাও এই ঝুঁকির বাইরে নেই।" অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানিয়েছেন, সরকার দেশের ৭টি বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র চালুর প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
মাদকের এই ভয়াল বিস্তার কেবল একক কোনো সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক যুদ্ধ। বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা আর মাদকের সহজলভ্যতা আমাদের তারুণ্যকে জম্বিতে রূপান্তরিত করছে। ঢাকার ফুটপাতে পড়ে থাকা ওই মানুষগুলো আমাদের দেশের যুবশক্তি। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে এই ৮২ লাখের সংখ্যা অচিরেই কোটি ছাড়িয়ে যাবে, যা একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
































