
মাসুম বিল্লাহ রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী সমুদ্র উপকূল জুড়ে এখন ব্যস্ততার এক ভিন্ন চিত্র। ভোরের আলো ফুটতেই গভীর সমুদ্র থেকে একের পর এক ফিশিং বোট ফিরে আসে তীরে। বোটভর্তি ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে টাইগার চিংড়ি। জেলেদের ভাষায়, এই চিংড়ির গায়ে ডোরা ডোরা দাগ থাকায় এর নাম হয়েছে ‘টাইগার চিংড়ি’। আন্তর্জাতিক বাজারে যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তীরে ভিড়তেই শুরু হয় আরেক কর্মযজ্ঞ। বোট থেকে নামানো তাজা চিংড়ি দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে উপক‚লের অস্থায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ ঘাটগুলোতে। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন শত শত নারী শ্রমিক। তারা দক্ষ হাতে চিংড়ি বাছাই, পরিষ্কার এবং প্রক্রিয়াজাত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাদের নিরলস পরিশ্রম। রাঙ্গাবালীর এই উপক‚লীয় অঞ্চলে শুধু মাছ ধরা নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। জেলে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী সহ সবাই এতে যুক্ত। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ এই খাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাদের হাত ধরেই উপক‚লের অর্থনীতি যেমন সচল হচ্ছে, তেমনি দেশের রপ্তানি খাতেও যুক্ত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সমুদ্রের বুকে ধরা পড়া টাইগার চিংড়ি শুধু একটি মাছ নয় বরং রাঙ্গাবালীর মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।স্থানীয় কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, আগে তারা সংসারের আয়-রোজগারে তেমন ভূমিকা রাখতে পারতেন না। কিন্তু এখন এই কাজের মাধ্যমে তারা নিয়মিত আয় করছেন। এতে তাদের পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা, বেড়েছে আত্মবিশ্বাসও। কেউ কেউ সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারছেন, আবার কেউ সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে স্বামীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন।মৎস্য সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর সেগুলো পাঠানো হয় হিমাগারে। সেখানে নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা হয় এই মূল্যবান জলজ সম্পদ। এরপর দেশের বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব চিংড়ি পাড়ি জমায় বিদেশের বাজারে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। টাইগার চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য পণ্য। সঠিকভাবে আহরণ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এই খাত থেকে আরও বেশি বৈদেশিক আয় সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতে ব্যস্ত নারী শ্রমিক রাহিমা বেগম বলেন, ‘আগে ঘরের কাজই ছিল আমার সবকিছু। সংসারে স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সমুদ্র থেকে আসা টাইগার চিংড়ি বাছাইর কাজ করে আমি নিজেও আয় করতে পারছি। এতে সংসারের খরচ চালাতে স্বামীকে সহযোগিতা করতে পারছি, সন্তানের পড়ালেখার খরচও কিছুটা বহন করতে পারছি। তিনি আরও বলেন, সমূদ্র থেকে ঘাটে বোট আসলেই আমরা চিংড়ি বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ করি। কাজটা কষ্টের হলেও টাকা আয় হওয়ায় ভালো লাগে। আমাদের মতো অনেক নারী এখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। মাছ ধরার ট্রলার মালিক মোঃ হানিফ হাওলাদার বলেন, ‘আমরা গভীর সমুদ্রে গিয়ে অনেক কষ্ট করে টাইগার চিংড়ি ধরি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো মাছ পাওয়া যায়, তখন আমাদের আয়ও কিছুটা বাড়ে। তবে ঝড়-জলোচ্ছাসের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে, তাই এই পেশায় অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। তিনি আরও বলেন, তীরে ফিরে আসার পর দ্রুত চিংড়ি নামিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, এতে স্থানীয় অনেক নারী শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে করে একদিকে আমাদের ব্যবসা সচল থাকছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষেরও কর্মসংস্থান তৈরী হয়েছে। সরকার যদি আমাদের জন্য আরও আধুনিক সরঞ্জাম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে মাছ আহরণ করতে পারবো এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবো।’সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ জহিরুন্নবী বলেন, ‘রাঙ্গাবালী উপক‚লীয় এলাকায় টাইগার চিংড়ি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। সমুদ্র থেকে আহরিত এই চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষ করে স্থানীয় নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এই খাতকে আরও গতিশীল করেছে। তারা দক্ষতার সঙ্গে চিংড়ি বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করছেন, ফলে তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে টাইগার চিংড়ি খাত ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’



























