
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান যতই থাকুক, গণমাধ্যম সক্রিয় ও স্বাধীন না হলে সেই অবস্থান বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ আইন প্রয়োগ হয় কাগজে-কলমে, আর গণমাধ্যম কাজ করে মানুষের বিবেক জাগ্রত করতে। রাষ্ট্রের চোখ যেখানে পৌঁছায় না, সেখানেই গণমাধ্যমকে পৌঁছাতে হয়—সত্যের সন্ধানে, জনস্বার্থের পক্ষে।
সময়ের বাস্তবতায় দেখা যায়, দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি সংগঠিত শক্তি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থ, প্রভাব, ক্ষমতা এবং ভয় দেখানোর রাজনীতি। এই শক্তি জানে—যদি সত্য প্রকাশ থেমে যায়, তাহলে জবাবদিহিও বন্ধ হয়ে যায়। তাই সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করা, বিভক্ত রাখা কিংবা ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখা দুর্নীতিবাজদের কৌশলেরই অংশ।
এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা যদি একা একা লড়াই করেন, তাহলে তারা দুর্বল হয়ে পড়েন। কিন্তু যখন সাংবাদিক সমাজ একসঙ্গে দাঁড়ান, তখন সেই ঐক্য ভয়কে শক্তিতে রূপ দেয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো অস্ত্র নয়—সাংবাদিকদের ঐক্যই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ। বহুবার দেখা গেছে, ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিকতার সামনে পড়ে ভেঙে পড়েছে দুর্নীতির দুর্গ, প্রকাশ্যে এসেছে বহুদিন লুকিয়ে রাখা সত্য।
ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, মতাদর্শগত পার্থক্যও অনিবার্য। তবে দুর্নীতি, অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নে সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো আপসের সুযোগ নেই। কারণ বিভক্ত সাংবাদিকতা প্রশ্ন তোলে না—বরং নীরবতা তৈরি করে। আর এই নীরবতাই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় মিত্র।
একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম গড়ে তুলতে হলে তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে।
প্রথমত, পেশাগত সংহতি। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, দলীয় আনুগত্য কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে আপসের সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। জনস্বার্থই হতে হবে সাংবাদিকতার একমাত্র দিকনির্দেশনা।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা। যদি সত্য বলার মূল্য হয় ভয়, মামলা কিংবা নিপীড়ন—তাহলে সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারে না। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে, স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
তৃতীয়ত, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা। গণমাধ্যমের শক্তি আসে মানুষের আস্থা থেকে। সেই আস্থা গড়ে ওঠে সততা, তথ্যনির্ভরতা ও আত্মজবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে।
দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের পথে আইন একটি হাতিয়ার, কিন্তু গণমাধ্যম সেই শক্তি, যা সমাজকে জাগিয়ে তোলে। তাই বলা যায়, সাংবাদিকরা যখন ঐক্যবদ্ধভাবে সত্যের পাশে দাঁড়ান, তখন দুর্নীতিবাজরা আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। কারণ একদিন না একদিন, সত্য আলো হয়ে অন্ধকার ভেদ করেই বেরিয়ে আসে।
মোঃ নাহিদ ইসলাম
বিভাগীয় প্রধান
দৈনিক আলোকিত সকাল






































