
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে থাকার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না জোটের শরিক দলগুলো। শরিক দলগুলো বলছে, গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ১৪ দলীয় জোটের কার্যকারিতা কমে গেছে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন বণ্টনে নানা গড়িমসি করে আওয়ামী লীগ। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে ৬ আসনে সমঝোতা হয় দলটির। কিন্তু এসব আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় জোটের মাত্র ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা এ কে এম রেজাউল করিম ছাড়া সবাই হেরেছেন।
এর পর থেকে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা হয়নি আওয়ামী লীগ ও জোটপ্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে। এমনকি জোটের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমুর সঙ্গেও কোনো আলোচনা হয়নি। বরং জোটের নেতারা, তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাইলেও তিনি বেশির ভাগ সময়ই এড়িয়ে যান। যদিও গত ২ মে থাইল্যান্ড সফর পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৪ দলীয় জোট আছে, ভবিষ্যতে থাকবে।
শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা বলেছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে ২০০৪ সাল থেকে ২৩ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪ দলীয় জোট। তখন মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ১৪ দল। তখন ব্যাপক কার্যক্রম চালায় ১৪ দল। রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে ১৪ দল। কিন্তু আমরা এখন জানি না ১৪ দল আছে কি না। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, ১৪ দল রাখা দরকার আছে, রাখবেন। সেটি তার ইচ্ছা। ১৪ দলীয় জোটে এখন আর কিছু নেই। ১৪ দল নামে আছে, কাজে নেই। যে সংগঠনের অ্যাক্টিভিটিস নেই, সেটি থাকা না থাকার কী আছে। তাকে তো বিলুপ্তই বলা যেতে পারে। এখানে থাকা, না থাকারও কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। ১৪ দলের কোনো কাজ নেই। যেখানে আমাদের মাঠে থাকার কথা। কাজ করার কথা। কিন্তু এখন ঘুমন্ত অবস্থায় আছে। গত ২ মে ১৪ দলীয় জোটের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু বলেছেন, ১৪ দল আছে, থাকবে। তাই আমরা অপেক্ষায় আছি, কবে প্রধানমন্ত্রী ডাকবেন। ১৪ দল থাকবে কী থাকবে না সেটাও সিদ্ধান্ত হবে, তিনি ডাকলে। দেখি তিনি ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে বসে কী বলেন। দেখি কী হয়।
তারা বলেন, ১৪ দল ২০০৪ সালে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখন ১৪ দল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। কাগজে-কলমে ১৪ দলীয় জোট থাকলেও জোটের কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে এই জোটের কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে ১৪ দলের শরিকরা অনেকটা চুপ হয়ে গেছে। ১৪ দলীয় জোটে থাকা না থাকার পুরোপুরি নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ওপর। তবে ১৪ দল আরও সক্রিয় হলেও আগের অবস্থায় আর যাবে না। কারণ বিএনপি-জামায়াতকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসতে ১৪ দলের প্রয়োজন ছিল আওয়ামী লীগের। এরপর টানা চার দফায় দলটি ক্ষমতায় থাকায় তারা এখন আর কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করছে না। এতে করে জোটের শরিক দলগুলোর প্রয়োজন নেই তাদের কাছে। ফলে তারা ‘একলা চলো নীতি’ নিয়েছে।
অন্যদিকে গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদ তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টি দুইটি ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) আসন দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা এ কে এম রেজাউল করিম ছাড়া সবাই হেরেছেন। ২০০৮ সালের পর এটিই ১৪ দলীয় জোটের কম আসন। এমনকি নির্বাচন পরবর্তী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালান শরিক নেতারা। এতেও কোনো লাভ হয়নি। পরে অবশ্য গণতন্ত্রী পার্টির কানন আরা বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি করা হয়। এর আগে ১৪ দলের শরিক দল থেকে নবম জাতীয় নির্বাচনে (২০০৮) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চারজন, দশম সংসদে (২০২৪) সংরক্ষিত দুইজনসহ ১৩ জন, একাদশ সংসদে (২০১৮) আটজন, দ্বাদশ সংসদে (২০২৪) যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুইজনে।
অন্যদিকে গত ৩ মে রাজধানীর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিরোধী দলের মোকাবিলায় আমাদের সুসংগঠিত হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ১৪ দলীয় জোটকেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে কাছে টানতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের নিজেদের সাবজেক্টিভ প্রিপারেশনের ওপর নির্ভর করে আমরা বাস্তব কঠিন পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ১৪ দলীয় জোটের এখন আর কিছু নেই। ১৪ দল নামে আছে। কাজে নেই। যে সংগঠনের অ্যাক্টিভিটিস নেই-সেটি থাকা না থাকার কী আছে। ফলে অনেকটা বিলুপ্ত বলা যেতে পারে। তারপরও জোটনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেহেতু বলেছেন, ১৪ দল আছে, থাকবে। তিনি ১৪ দলের জোটের সঙ্গে বসবেন। দেখি তিনি বসেন কি না। আর বসলে কী বলেন, তা শুনি। তবে আমরা তার ডাকের অপেক্ষায় নেই। দেখি কী হয়। এখন যে পরিস্থিতিতে ১৪ দল রয়েছে, তা থাকা, না থাকার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, আমি জানি না ১৪ দল আছে কি না। ১৪ দলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা যদি ডাকেন, তা হলে যাব। আর না ডাকলে যাব না। আওয়ামী লীগ বা জোটপ্রধান যদি মনে করেন, ১৪ দল রাখা দরকার আছে, রাখবেন। সেটি তার ইচ্ছা। তবে ১৪ দল আছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে না।
বাসদ আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান বলেন, ১৪ দলে এখন কোনো মেসেজ নেই। আলোচনা হবে, আলোচনায় কোন পরিস্থিতি দাঁড়ায় সেটি দেখি। অনেকেই বলেন যে, ১৪ দলে থেকে ভুল করেছি। যেখানে আমাদের মাঠে থাকার কথা। কাজ করার কথা। কিন্তু এখন ঘুমানোর অবস্থায় পড়ে আছি। তবে এখন নিজের দল গোছানোর চেষ্টা করছি। ১৪ দলীয় জোটের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৪ দল আছে, থাকবে। এখন আমরা সেই অপেক্ষায় আছি। কবে ডাকবেন প্রধানমন্ত্রী। তার ডাকের অপেক্ষায় আছি। ১৪ দল থাকবে কী থাকবে না, সেটাও সিদ্ধান্ত হবে তিনি ডাকলে। আমরা হয়তো আরও কিছুদিন দেখব।
জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ১৪ দলীয় জোটকে এখন অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলা যায়। জোটের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। ফলে জোট নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এখন ১৪ দলকে সক্রিয় করবে কী করবে না, সেটা আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করছে।
উল্লেখ্য, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে মিলে মহাজোট গড়ে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। মহাজোট সরকারের সময় ১০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত ১৪ দলের কর্মসূচি কমে এলেও ধারাবাহিকতা ছিল। জাতীয় পার্টির (জাপা) পাশাপাশি ১৪ দলের শরিক তিনটি দলের তিনজন মন্ত্রী হয়েছেন। তারা হলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু ও সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া।







































