
মো আনিছুর রহমানকে (স্টাফ রিপোর্টার) ব্রাহ্মণবাড়িয়ারঃ
কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরে ইটভাটায় কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আবুল খায়ের নামে এক যুবক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া গ্রামের আব্দুল জাব্বারের ছেলে আবুল খায়েরের স্বপ্ন যেন নিমিষেই শেষ।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অকূল পাথারে পড়েছেন আবুল খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার। বারবার বিলাপ করে বলছিলেন, 'আমার স্বামীকে দেখতে চাই। আমার পুলারে কোলে নিতে পারলো না হের বাপে।'
ছোট্ট আরহামের জন্মের আগেই কিরগিজস্তানে পাড়ি জমান বাবা আবুল খায়ের (৪২)। তাই বাবাকে কখনো ছুঁতে পারেনি সে। বাবা আবুল খায়েরেরও সন্তানকে দেখার তীব্র তৃষ্ণা। হাজার মাইল দূর থেকে সন্তানকে দেখার সেই তৃষ্ণা মেটে ভিডিও কলে।
আরহামের বয়স এখন ১৫ মাস। আধো আধো কণ্ঠে 'বাবা, বাবা' বলে ডাকে। বাবার সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠছে কেবল! এরই মধ্যে বাবা নামের বটবৃক্ষ হারিয়েছে সে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট আবুল খায়ের। তার বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। অভাব-অনটনের মধ্যেই বেড়ে উঠা খায়েরের। তাই অভাব দূর করতে পরিবারের জন্য সুখের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে বিয়ের মাত্র ৫ মাসের মাথায় পাড়ি জমান কিরগিজস্তানে।
বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় চার লাখ টাকা যোগাড় করতে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মাত্র দেড় শতাংশ জমিটুকুও বিক্রি করে দেন। কিছু টাকা ঋণও নেন। কিন্তু বিদেশে গিয়েও ভাগ্য ফেরেনি খায়েরের।
গত ২০ মার্চ দুপুরে ইটভাটায় কাজ করার সময় হঠাৎ করে মাটির স্তূপ ধ্বসে পড়ে খায়েরের ওপর। সহকর্মীরা তাকে উদ্ধারের আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। শেষ হয় তার জীবন-সংগ্রাম।
খায়েরের পরিবারের সদস্যরা জানান, কিরগিজস্তান যাওয়ার আগে কিছুদিন সৌদি আরবে ছিলেন খায়ের। কিন্তু সেখানে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফেরত চলে আসেন। এরপর বছর দেড়েক বাড়িতে থাকার পর ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার বনানী এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে কিরগিজস্তান যান খায়ের।
স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ আবুল খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার। একদিকে স্বামীর মৃত্যু, অন্যদিকে সন্তানের অনিশ্চত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ফেলফেল করে তাকিয়ে ছিলেন তিনি।
হামিদা আক্তার বলেন, '২০ মার্চ সকালে ফোন করেছিল খায়ের। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কাজে যাবে কি না, বলেছিল যাবে না। এরপর ছেলেকে দেখেছে। পরে আবার একবার ফোন করে কথা বলেছে। এরপর সারাদিন আর কথা হয়নি। বিকেলে আমি ফোন করার পর তার সঙ্গে কাজ করা একজন ফোন রিসিভ করেন। আমার সঙ্গে কথা না বলে আমার ভাসুরের সঙ্গে কথা বলেছেন। একপর্যায়ে জানিয়েছে খায়ের কাজ করার সময় বুকে ব্যাথা পেয়ে মারা গেছে।'
খায়েরের বড় ভাই রফিক মিয়া বলেন, 'খায়েরের সহায়-সম্পদ বলতে কিচ্ছু নেই। বিদেশ যাওয়ার জন্য শেষ সম্বল বাড়ির জায়গাটুকুও বিক্রি করে দিয়ে গেছে। পরে তার স্ত্রী-সন্তানকে থাকার জন্য আমি আমার জায়গায় ঘর করতে দিয়েছি।' আগামী শনিবার বা রবিবার খায়েরের লাশ দেশে পাঠানো হতে পারে।




























