
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটকে আদর্শিক বলা হলেও কার্যত নির্বাচনি বৈতরণী পাড়ি বা ক্ষমতায় যাওয়ার জোট বলে মনে করছেন শরিকরা। শরিক দলগুলোর নেতারা বলেন, গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর এ পর্যন্ত জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা করেনি আওয়ামী লীগ। ফলে জোটে রাখা না-রাখা নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে শরিকরা। সংগত কারণে এ অস্বস্তির অবসান চায় শরিক দলগুলো। এভাবে চলতে থাকলে দুয়েক মাস পর ১৪ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা জোট গঠন করতে পারেন শরিকরা। অবশ্য আওয়ামী লীগ বলছে, গত ১৫ বছরে সরকারের সঙ্গে থেকে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
জোটসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই শুনতে চায়, তারা জোট রাখতে চায় কি চায় না। কারণ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ শরিক দলগুলোকে আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। এতে এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা থেকে বের হওয়া উচিত। তবে কোনো কোনো শরিক দল এখনও আওয়ামী লীগের ওপর আস্থাশীল। তারা হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ দলই ১৪ জোট থেকে বেরিয়ে আলাদা জোট গঠনের পক্ষে। তারা নিজেদের অবস্থান থেকেই আন্দোলন-সংগ্রাম করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে চায়। দেশের অর্থনৈতিক যে অবস্থা এখন নিজেদের অবস্থান তৈরি করে মাঠে নামার বিকল্প দেখছে না কোনো কোনো শরিক দল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সময় এসেছে। সেই দিক থেকে আন্দোলন-সংগ্রামের বিকল্প নেই। ১৪ দলের শরিক দলগুলো যদি জনগণের প্রয়োজনেই না আসে, এমন রাজনীতি করে কী লাভ? তাই বিকল্প জোট বা আলাদা কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে মাঠে নামার কথা ভাবছে বেশিরভাগ শরিক দল।
কোনো কোনো শরিক দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, গত ১৫ বছর ধরে ১৪ দলীয় জোটকে আদর্শিক জোট বলে আসছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আসলে তারা মুখে আদর্শিক জোট বললেও এটি ছিল তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার। বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপরীতে ১৪ দলীয় জোটকে সামনে নিয়ে হাঁটার একটি কৌশল ছিলমাত্র। ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এ সময়ের মধ্যে দুয়েকজনকে ছিটেফোঁটা সুযোগ-সুবিধা দিলেও কার্যত ১৪ দলের শরিকদের তেমন কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১৪ দলের সামনে মুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়। জোটের মনোয়নের ক্ষেত্রে ১৪ দলের বিষয়ে উদাসীন ছিল আওয়ামী লীগ। তারপরেও ১৪ দল মনে করেছিল নির্বাচনের পর জোটনেত্রী শেখ হাসিনা শরিকদের নিয়ে বসে তাদের কথা শুনবেন। তার কোনো কিছুই হয়নি। ফলে জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা হতাশায় ভুগছেন। এভাবে চলতে পারে না। রমজানের পর দুয়েক মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ শরিকদের নিয়ে না বসলে বিকল্প চিন্তা করা হবে। এমনকি আওয়ামী লীগের বাইরে জোটের অন্য যে দলগুলো আছে, তারা আলাদা জোট নিয়ে মাঠে থাকবে।
তারা বলেন, ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু ওমরাহ পালন করতে গেছেন। তিনি যাওয়ার আগে বলেছেন, জোটনেত্রী শেখ হাসিনা ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে বসবেন। তিনি সময় দিলেই আমরা বসব। কিন্তু এখন বসে আর কী হবে? নির্বাচন হয়ে গেছে। মন্ত্রিসভা গঠন হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। এখন তো আর কোনো কিছু বাকি নেই। এখন বসে আর আমাদের কী আশ্বস্ত করবেন শেখ হাসিনা। তবুও যেহেতু জোটনেত্রী আমাদের ডেকে ১৪ দল গঠন করেছিলেন, এখন আমরা তার অপেক্ষায় আছি তিনি কবে বলবেন যে, ১৪ দলীয় জোট দরকার নেই।
এদিকে গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদকে তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে দুটি ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) একটি আসন দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা একেএম রেজাউল করিম ছাড়া সবাই হেরেছেন। আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় বাকি পাঁচজনই হেরেছেন। ২০০৮ সালের পর এটিই ১৪ দলীয় জোটের কম আসন। এমনকি নির্বাচন-পরবর্তী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালান শরিক নেতারা। এতেও কোনো লাভ হয়নি। পরে অবশ্য গণতন্ত্রী পার্টির কানন আরা বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি করা হয়।
জোটের এক শরিক দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ১৫ বছর ধরে কিছু না পেয়েও ১৪ দলের সঙ্গে ছিলাম। এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে থাকা না থাকা সমান। এখন আর আওয়ামী লীগের কোনো কাজে লাগছে না ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। কাউকে কিছু বলতে পারছি না। আমাদের নেতাকর্মীরাও প্রশ্ন করেন, ১৪ দলে থেকে লাভ কী? আমার তো পেটে পাথর বেঁধে নেই। এ থেকে বের হয়ে আসাই ভালো। আমরা ১৫ বছর না খেয়ে থেকেছি। আগামী ৫ বছর না খেয়ে তাদের সঙ্গে না থাকাই ভালো। বরং আমাদের দলকেই গুছিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করা উচিত। কারণ আমরা তো আন্দোলন-সংগ্রাম করেই আজ এ পর্যন্ত এসেছি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ওবলেন, ১৪ দলীয় জোট তো আছে। আমরা তো সব সময়ই বলে আসছি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি যারা আছে, তাদের নিয়ে একসঙ্গে পথ চলতে চাই। তবে তাদের যদি কোনো কথা থাকে, সেটি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জোটনেত্রী শেখ হাসিনার কাছে তো বলতেই পারে। রাশেদ খান মেমন তো সংসদেই আছেন। ফলে তাদের কথা বলার সুযোগ আছে। তবে তারা গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে যে সাংগঠনিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে পারত, তাতে তারা কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তো আছেই। জোটনেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সঙ্গে বসবেন বলে জানিয়েছেন ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু। আমরা তার সঙ্গে বসার অপেক্ষায় আছি। তবে কবে তিনি বসবেন সেটি এখনও জানানো হয়নি। জোটের মধ্যে ক্ষোভ তো থাকতেই পারে। ১৪ দলীয় জোট থাকবে কি না, সেটা সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগ। রাজনীতি যেহেতু করি তাই জাসদ নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
বাংলাদের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ১৪ দলীয় জোট এখনও আছে। ওয়ার্কার্স পার্টি সংসদ ও সংসদের বাইরে জনগণের পাশে আছে, থাকবে। তবে ১৪ দলীয় জোট যে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরেক শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া জোট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ বড় দল। তারা ১৪ দলের নিয়ামক শক্তি। তারা কী করে একটু দেখি। আওয়ামী লীগ বলে আসছে ১৪ দলীয় জোট আদর্শিক; কিন্তু এখন তো আর সেটি মনে হয় না। তারা ক্ষমতায় যেতে ১৪ দলীয় জোটকে ব্যবহার করেছে মাত্র। তবে জোটনেত্রী শেখ হাসিনা বলে দিলেই তো পারেন, তিনি ১৪ দলীয় জোট রাখবেন না। আমরা দীর্ঘদিন লড়াই-সংগ্রম করেছি। তারা না রাখলে ছোট দল, ছোট হিসেবেই থাকব। আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাব। এভাবে তো আর থাকা যায় না। এর একটি বিহিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) আহ্বয়ক রেজাউর রশিদ খান বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, সর্বহারার তো হারাবার কিছু নেই। এখন দলের সাংগঠনিক কাজগুলো করছি। জোট নিয়ে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এর অবসান হওয়া উচিত। নেতাকর্মীরা নানা প্রশ্ন করেন। তার উত্তর দিতে পারি না। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী আওয়ামী লীগের আচরণ ভালো মনে হচ্ছে না। এতে ১৪ দলের কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না। তারা ক্ষমতায় যেতে আমাদের ব্যবহার করেছে।’
গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোট আদর্শিক জোট বলা হলেও অবস্থাদৃষ্টে সেটি এখন নেই। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। তাদের জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে থেকেও আমরা জনসমর্থন পাওয়ার কাজগুলো করতে পারিনি। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ আমাদের ব্যবহার করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নানা ষড়যন্ত্র ছিল। সেগুলো এখনও আছে। সেটি জোটনেত্রী শেখ হাসিনাকে বুঝতে হবে। আর সেটি না হলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দলকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, বামপন্থি ১১ দল ও আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও জাসদ নিয়ে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪ দলীয় জোট। এরপর গত ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট বিজয় লাভ করে। ওই সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। এরপর আর তাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। ওই নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে এমপি হন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর তাকে সর্বদলীয় সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মন্ত্রিসভায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে টানা ৭ বছর ছিলেন। পরে তাকে আর মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। এরপর ১৪ দলের শরিকদের কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি।







































