
মাত্র এক মাস আগে ইমন ও শিপন নামে দুই যুবক ছিনতাইয়ের মামলায় গ্রেফতার হন। মাস যেতে না যেতেই জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও যুক্ত হন ছিনতাইয়ের কাজে। পুলিশের হাতে ধরা খান ফের।
মো. শাহাদাত চুরির মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন এক মাস। সেখান থেকে জামিনে বের হন মাত্র চার দিনে। এরপর আবার চুরি করেন এবং পুলিশের হাতে আবারও গ্রেফতার হন। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার শাহাদাত স্বর্ণালংকার চুরি করে নিজের স্ত্রীকে দেন। এরপর স্ত্রী সেই স্বর্ণালংকার জুয়েলারি দোকানে বিক্রি করতেন।
মো. সেলিম নামে এক যুবকের ছিনতাইকারী হিসেবে নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ছিনতাই করেন। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রথমবার তাকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকার কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে। তখন দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। এরপর জামিনে বেরিয়ে ফের শুরু করেন ছিনতাই। পরে আরও ১০ বার গ্রেফতার হন, তবে প্রতিবারই জামিনে বেরিয়েছেন এবং যথারীতি জড়িয়ে পড়েছেন অপরাধে।
ইমন শিপন, শাহাদাত কিংবা সেলিমের মতো ঢাকায় অনেক ছিনতাইকারীই গ্রেফতারের এক থেকে তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। কেউ আবার বের হন সপ্তাহের ব্যবধানেই।
পুলিশ ও আইনজীবীরা বলছেন, চুরি-ছিনতাইয়ের মামলায় জামিন ডালভাতের মতো সহজ ব্যাপার। জামিনে বাইরে এসে আবারও অপরাধ জগতে বিচরণ শুরু করেন ছিনতাইকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকায় দাপিয়ে বেড়ায় আট হাজারের বেশি ছিনতাইকারী। তাদের বড় অংশের নামে ১০টির বেশি ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। আর ৫-৯টি মামলা রয়েছে অর্ধেকের বেশি ছিনতাইকারীর নামে। এসব মামলায় অনেকের সাজা হয়ে গেছে। তারপরও তাদের কাছে কারাগার নিছক ডালভাত।
পুলিশ বলছে, ছিনতাই মামলার আসামিদের জামিন করিয়ে আনা আইনজীবীদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা এসব আসামির বিষয়ে খোঁজখবর রাখবেন বলে আদালতের কাছে অঙ্গীকার করলেও জামিনের পর আর কোনো খোঁজ রাখেন না।
ছিনতাইয়ের শিকার হলেও পুলিশের দ্বারস্থ হন না অনেকে
বেসরকারি চাকরিজীবী নাসরিন হক (৪১) স্বামী-সন্তানসহ থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডিতে। ঈদ-উৎসবে যান শ্বশুরবাড়ি, রাজশাহীতে। উৎসবের ছুটি এগিয়ে আসতেই ঘরের সবাই খুশি। কিন্তু চিন্তা বাড়ে নাসরিন হকের। গয়না রাখবেন কোথায়, ল্যাপটপ দুটির কী হবে, বিপদের জন্য জমানো টাকাগুলোরই কী ব্যবস্থা করবেন—এসব ভেবে রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না, ঠিকমতো উপভোগ করতে পারেন না ছুটির আনন্দও।
নাসরিন হকের ভাষায়, ‘সারা বছরই ভয়ে থাকি চুরি-ডাকাতির। যেকোনো ছুটির সময় সেটা বেড়ে রূপ নেয় আতঙ্কে। পাগল পাগল লাগে। মনে হয় বিক্রি করে দিই সব গয়নাগাটি। পারি না মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।’ শুধু নাসরিন হক নন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক মূল্যবান সম্পদ চুরি বা ভাঙচুর নিয়ে থাকে উদ্বেগে। সম্পদের নিরাপত্তার শঙ্কা সারা দিনই ঘুরপাক খায় অনেকের মাথায়, যার প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেও।
বিষয়টি নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকারের ভাষ্য, দেশে মানুষের ব্যক্তিগত সংকটে সরকারি ব্যবস্থায় সমাধান করার সুযোগ খুব সীমিত। ফলে স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান জিনিসপত্র ভবিষ্যতের বিপৎকালীন রক্ষাকবচ হিসেবে রাখে মানুষ। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিবেচনায় মূল্যবান জিনিস হারানোর ভয়েও থাকেন তারা।
মেখলা সরকার জানালেন, উদ্বেগের মাত্রা বেশি হলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে ঘুমে। ব্যাহত হয় অন্যের প্রতি বিশ্বাস রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন। তখন দৌড়াতে হয় চিকিৎসকের কাছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে-২০২৫’ শীর্ষক জরিপে উঠে এসেছে সম্পদ নিয়ে উদ্বেগের এ চিত্র। জরিপের ফলাফল বলছে, সম্পদ নিয়ে শহর এলাকার মধ্যে ঢাকার বাসিন্দাদের উদ্বেগ বেশি। তবে গ্রাম এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এ হার কিছুটা কম। আবার পুরুষের তুলনায় সম্পদ নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন নারীরা। মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা প্রায় একই রকম। তবে বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা কিছুটা কম, ৩৪ শতাংশ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যেও এমন। উদ্বেগের মাত্রায় ভূমিকা রাখে আয়-সম্পদের পরিমাণও।
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশ করা হয় জরিপের ফলাফল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশের ৮৪ হাজার ৮০৭ নারী-পুরুষের মধ্যে চালায় সাক্ষাৎকারভিত্তিক জরিপটি। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ বছর বা তার বেশি। জরিপে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও বৈষম্যকে মূল্যায়ন করা হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আলোকে।
জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয়ভাবে ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ তাদের মূল্যবান সম্পদ চুরি বা ভাঙচুর হওয়ার আশঙ্কায় চিন্তিত। শহর এলাকার ৫১ শতাংশ অধিবাসী উদ্বিগ্ন তাদের সম্পদ নিয়ে। পল্লী এলাকায় এ হার ৪৬ শতাংশ। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় উদ্বেগের হার সর্বোচ্চ ৫৯ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগ কম খুলনায় ৩৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৩৭)। পুরনো গাড়ি কিনে সেটিতে প্রয়োজনীয় সারাই করিয়ে, রং করিয়ে বিক্রি করাই তার ব্যবসা। যেকোনো সময় গাড়ি কিনতে হতে পারে বলে বড় অঙ্কের টাকা ঘরে রাখতে হয় তাকে। আর তার চিন্তার জায়গা এটাই—কোথায় রাখবেন টাকা। মাঝেমধ্যে ঘুম থেকে উঠে এক জায়গা থেকে সরিয়ে আরেক জায়গায় রাখেন টাকা। দরজা-জানালা ঠিকমতো লাগিয়েছেন কি না, সেটাও পরীক্ষা করেন বারবার। আবার স্বস্তি পান না গাড়ি চুরি হতে পারে— এমন শঙ্কায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. মারুফ হোসেনের বক্তব্য, ‘মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে কাজ করা হচ্ছে। দেশ একটা বিশেষ পরিস্থিতি পার হয়েছে। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবুও চেষ্টা চলছে।’
গত ১৫ মার্চ, ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার রাজধানীবাসীকে ঈদে ঢাকা ছাড়ার আগে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় রেখে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ঢাকায় কারও স্বজন না থাকলে তা থানায় রেখে যেতেও বলেন তিনি।
তবে স্বর্ণের দাম বাড়ার পর আত্মীয়-স্বজনরাও নিতে চাচ্ছেন না দায়িত্ব। সিলেটের সুমাইয়া বেগমের (৪৩) নিজের ও মেয়ের মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণের গয়না আছে। তিনি আগে বাবার বাড়ি বা অন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় গয়নাগুলো রেখে যেতেন বড় বোনের কাছে। তবে স্বর্ণের দাম বাড়ার পর থেকে বোন আর গয়না রাখতে রাজি হচ্ছেন না। এ কারণে তিনি বেড়াতে গিয়ে করেন না রাত যাপন। ফিরে আসেন দিনে দিনে। নিরাপত্তা জোরদার করতে বাসায় লাগিয়েছেন ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।
গৃহিণী সুমাইয়া বেগমের ভাষ্য, ‘গয়না এখন আমার লাগি গলার কাঁটা। সব সময় মনে অয় চুর অইজিবো। নতুন কামের মানুষ রাখতাম পারি না, কোথাও যাইতাম পারি না। পাহারাদারের লাখান দেখিয়া রাখতে অয়।’




























