
মনির হোসেন সুমন:
একসময় পাসপোর্ট করতে গেলে মানুষের মনে ভেসে উঠত দালালের দৌরাত্ম্য, দীর্ঘ লাইন আর অনিশ্চয়তার ছবি। সেই চেনা বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে। দালালমুক্ত পরিবেশ, দ্রুত সেবা আর সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
২০২৪ সালের অগ্নিকাণ্ডে পুরো অফিস পুড়ে যাওয়ার পর কার্যক্রম প্রায় আট থেকে নয় মাস বন্ধ ছিল। পরে ২০২৫ সালের ৪ মে সংস্কারকৃত ভবনে আবার শুরু হয় কাজ। নতুন করে যাত্রার চার দিন পর, ৮ মে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন শামীম আহমদ। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে সেবার ধরন।
অফিস সূত্র জানায়, আগুনে প্রায় সাড়ে সাত হাজার পাসপোর্ট নষ্ট হয়েছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেগুলো পুনরায় প্রস্তুত করা হয়। নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পর লক্ষ্য ছিল; ভোগান্তি কমিয়ে সহজ সেবা নিশ্চিত করা।
এখন অফিসে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। গেটে আনসার ও স্টাফ মোতায়েন রয়েছে, দালালদের প্রবেশে কড়াকড়ি। কোনো অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। উপপরিচালকের কক্ষও আবেদনকারীদের জন্য উন্মুক্ত; যেখানে যে কেউ প্রয়োজনে সরাসরি কথা বলতে পারেন।
প্রতি মাসে এখানে আবেদন করছেন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ। দৈনিক গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন সেবা পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিকাংশ পাসপোর্ট প্রস্তুত হচ্ছে এবং জটিলতা ছাড়াই আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে নারায়ণগঞ্জে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাজের খোঁজে আসেন অনেক মানুষ। তাদের জন্যও রাখা হয়েছে সুযোগ। বৈধ চাকরি বা বসবাসের প্রমাণ দেখাতে পারলে অন্য জেলার নাগরিকরাও এখান থেকে পাসপোর্ট করতে পারছেন। তবে যথাযথ কাগজপত্র না থাকলে নিজ নিজ জেলায় আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে অফিসটি। ইতোমধ্যে সাতজন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে; যা এই অফিসের জন্য একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেবা নিতে আসা অনেকেই বলছেন, আগে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো, এখন সেখানে ২০ থেকে ৩০ মিনিটেই কাজ শেষ হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত খরচও করতে হচ্ছে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে এখনো দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
উপপরিচালক শামীম আহমদের ভাষ্য, পাসপোর্ট একটি নাগরিক অধিকার। সঠিক কাগজপত্র থাকলে কেউ যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি আবেদনকারীদের নিজে বা পরিচিতজনের মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দেন এবং দালাল এড়িয়ে চলতে বলেন।
সব মিলিয়ে স্বচ্ছতা, দ্রুততা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সরকারি সেবার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠছে।





























