
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলরসহ শীর্ষ পদে থাকা অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী আত্মগোপনে চলে যান। এতে করে নগরের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নগরের সেবা অব্যাহত রাখতে তড়িঘড়ি করে সিটি করপোরেশনে মেয়রের স্থলে বসানো হয় প্রশাসক। অন্যদিকে কাউন্সিলরদের স্থলে দায়িত্ব পান আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা।
মেয়র কাউন্সিলরদের শূন্যস্থান পূরণের ফলে নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কিছুটা গতিশীলতা ফিরলেও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এখনও থমকে আছে। গত বছরে দুই সিটি করপোরেশনের নেওয়া উন্নয়নমূলক বেশিরভাগ কাজই এখন থমকে আছে নানা কারণে। কী কারণে থমকে আছে, কবে থেকে সেসব উন্নয়নমূলক কাজ চালু হবে; তা জানানোর মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সাত গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রধান নেই। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহীসহ দুটি দফতরের প্রধান নেই। ফলে দায়িত্বশীলদের অভাবে থমকে আছে দুই সিটি করপোরেশনের নানান উন্নয়নমূলক ও স্বাভাবিক কার্যক্রম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির শীর্ষ পদে থাকা একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা না থাকায় অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। কবে নাগাদ শীর্ষ এই দুটি পদ পূরণ হবে তাও জানা নেই। তাছাড়া কাজ জানাশোনা ছাড়া হুট করে আমলাদের থেকে একজনকেই বসিয়ে দিলেই তো আর কাজে গতিশীলতা ফিরবে না। এর জন্য এইসব বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ নিয়োগ পেলেই বরং সবার জন্য সুবিধা।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আগে সিটি করপোরেশনের যেকোনও কর্মকাণ্ড বা নগরীর সুবিধা-অসুবিধা সমাধানের জন্য মেয়র-কাউন্সিলরসহ আমরা যারা বিভিন্ন দফতরের দায়িত্বে থাকতাম, তাদের নিয়ে আলোচনা করা হতো। সবাই সবার মতামত ব্যক্ত করতো। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। ফলে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ থেমে আছে। তাছাড়া যে-সকল চলমান উন্নয়নমূলক কাজ সরকার পতনের পর থেমে গেছে সেখানে আবার নতুন করে দরপত্র নির্ধারণ করে ঠিকাদারের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।’
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ডিএসসিসি প্রশাসক পদে থাকা নজরুল ইসলাম গত ৬ জানুয়ারি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব পদে পদোন্নতি পান। তিনি চলে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত এই পদে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। ফলে দুই সপ্তাহের বেশি ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে খালি। অন্যদিকে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান গত ২৪ ডিসেম্বর অবসরে যান। তার এক সপ্তাহের মাথায় অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও অবসরে গেছেন।
এছাড়া প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, প্রধান অডিট কর্মকর্তা ও প্রশাসকের পিএস বদলিজনিত কারণে সিটি করপোরেশন ত্যাগ করেন। এরপর নতুন করে এখন পর্যন্ত নতুন কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান। এরপর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সেখানে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। এছাড়াও ডিএনসিসির প্রধান নিরীক্ষা কর্মকর্তা ও আইন কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে জনপ্রতিনিধি না থাকায় করপোরেশনে চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে বলে জানান দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী। ডিএসসিসির প্রকৌশলী বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, মেয়র-কাউন্সিলরদের অভাব আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বাইরে থেকে লোকজন এসে যাকে যেভাবে পারছে, টেন্ডারের জন্য ধমক দিচ্ছে। সিটি করপোরেশনের কর্মচারীর সামনেই কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে যাচ্ছে বহিরাগতরা।
গুরুত্বপূর্ণ সাত পদ শূন্য থাকা এবং সার্বিক কার্যক্রমের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সচিব মোহাম্মদ বশিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, আমাদের রুটিন কাজ চলমান আছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি থাকায় কাজে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে দ্রুত এসব পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সচিব মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিক বলেন, পদগুলো খালি থাকায় বাড়তি সময় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে এসব পদে দ্রুত পদায়নের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কবে নাগাদ সিটি করপোরেশনের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, এমন প্রশ্নের জবাব জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মেইল করা হলেও তার কোনও জবাব মেলেনি। তবে এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, সিটি করপোরেশনের শূন্য পদে পদায়নের কাজ চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব পদ যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। তাই কিছুটা সময় লাগছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব পদে পদায়ন করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।







































