
আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির বা ডুয়েটের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ঠিক ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালের এই দিনে নতুন পরিচয়ে যাত্রা শুরু করে তৎকালীন বিআইটি ঢাকা। একটি আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারের স্বায়ত্তশাসিত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং আজকের ডুয়েট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আজ সেই যাত্রার ২৩ বছর পূর্ণ হলো। তবে ডুয়েটের গল্পটা ২০০৩ সালে শুরু হয়নি। এর শুরু আরও আগে ১৯৮০ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে। আর আজ যে ডুয়েট নামটি একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করছে সেই নামটিও শুরু থেকে এমন ছিল না। এর পেছনে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঐক্য সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয় রক্ষার এক দৃঢ় প্রত্যয়।
১৯৮০ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং ঢাকা নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সময় এখানে সিভিল ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল এই তিনটি বিষয়ে স্নাতক প্রকৌশল শিক্ষা চালু ছিল। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রাখা হয় এবং এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে তেজগাঁওয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে বর্তমান স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। এরপর আসে ১৯৮৬ সালের অধ্যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ঢাকা বা বিআইটি ঢাকা। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানের সুযোগ পায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে একাডেমিক ভবন ছাত্রাবাস কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মেডিকেল সেন্টার ছাত্রকল্যাণ কেন্দ্র ও অডিটোরিয়ামসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
যে আন্দোলনের ফসল আজকের ডুয়েট
১৯৮৬ সালে দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে বিআইটি করা হলে নামকরণের ক্ষেত্রে জেলার পরিবর্তে বিভাগের নাম যুক্ত করার রীতি অনুসরণ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী খুলনা ও চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম হয় বিআইটি রাজশাহী বিআইটি খুলনা ও বিআইটি চট্টগ্রাম। একই কাঠামোগত যুক্তিতে গাজীপুর জেলায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এর নাম রাখা হয় বিআইটি ঢাকা। ২০০৩ সালে বিআইটিগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলে অন্যান্য বিআইটি তাদের প্রতিষ্ঠিত বিভাগীয় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন নামে আত্মপ্রকাশের পথে এগোয়। কিন্তু বিআইটি ঢাকার ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা অনুসরণ না করে গাজীপুর প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামের প্রস্তাব আসে।
এই প্রস্তাবই বিআইটি ঢাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল স্পষ্ট প্রতিষ্ঠানটির নাম হতে হবে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের কাছে ঢাকা শুধু একটি ভৌগোলিক নাম ছিল না এটি ছিল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অংশ। নামকরণের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। তবে এই আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল এর অহিংস সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল পদ্ধতি। দলমত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা ডুয়েট গাজীপুর বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে একত্রিত হন। তৎকালীন ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও অভিন্ন দাবিতে একই প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নেন।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসে চালু করা হয় ডুয়েট বেতার কেন্দ্র। সেখানে গান কবিতা নাটক ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পাঠ করা হতো। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ব্যানার তৈরি করেন এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের দাবি বাস্তবায়িত হয় এবং বিআইটি ঢাকা রূপান্তরিত হয় আজকের ডুয়েটে।
চার দশকের পথচলায় বিস্তৃত একাডেমিক পরিসর
আজ ডুয়েট দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে চারটি অনুষদের অধীনে ১৪টি বিভাগ তিনটি ইনস্টিটিউট ও একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তি করা হয়। ২০২৫ এবং ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার প্রোগ্রামে ৭৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার বিষয়টি ডুয়েটের প্রতি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাহিদার প্রতিফলন। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ডুয়েটে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ক্যাম্পাসব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে।
অর্জনের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংকট
চার দশকের বেশি সময়ের পথচলায় ডুয়েট দেশের প্রকৌশল শিক্ষাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। ডুয়েটের গ্র্যাজুয়েটরা দেশে বিদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে যেমন টেসলা অ্যামাজন ও মেটার মতো জায়গায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। তবে এই বিপুল সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু সংকট। ডুয়েটের সবচেয়ে বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত জমির অভাব। বর্তমানে মাত্র ২৫ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত সীমিত। ক্যাম্পাসে এখনো নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ মুক্তমঞ্চ বিনোদন পার্ক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের জন্য পর্যাপ্ত অফিস কক্ষ। নেই ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পর্যাপ্ত গবেষণাগার ও গবেষণা সুবিধার সংকটও প্রকট।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট থাকলেও নতুন হল নির্মাণের মাধ্যমে সেটি হয়তো কিছুটা কাটবে। তবে নতুন অবকাঠামোর জায়গা করে দিতে ভেঙে ফেলতে হয়েছে অ্যালামনাইদের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হল এফ আর খান হল এবং খুদরত ই খুদা হল। প্রশ্ন উঠেছে এই অগ্রগতির বিনিময়ে ডুয়েটের পুরোনো স্মৃতি ও ঐতিহ্যের কতটা হারিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নানা সংকট। যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা নেই। সেখানে এখনো মসজিদ লিফট ও ক্যান্টিনের মতো মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি হাজারো সফল গ্র্যাজুয়েট দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকলেও তাঁদের নিয়ে নিজস্ব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এখনো গড়ে ওঠেনি।
আজ ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ডুয়েট তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার ২৩ বছর পার করল। দেশের জন্য অকাতরে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠানের মৌলিক অবকাঠামোগত সংকট আর কতদিন থাকবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের জমি ও অবকাঠামোগত সংকটের স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আজ যে ডুয়েট নামটি সবাই গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করে তার পেছনে থাকা শিক্ষার্থীদের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন প্রমাণ করে যৌক্তিক দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হলে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনই সম্ভব।
মো. রাকিবুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, ডুয়েট





































