
এম এম ইউসুফ আলী
যেসব প্রথীতযশা আলেম বাংলার যমীনকে ইল্ম, আমল ও তাক্বওয়ার মাধ্যমে আবাদ করেছেন, যাঁদের নামের ইতিহাস এদেশের সর্বশ্রেণির মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, তাঁদের মধ্যে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের ধোড়করা জনপদের প্রখ্যাত আলেম পরিবারের নূরানী সন্তান, হযরতুল আল্লামা মুহাদ্দিস আবু নঈম মো. ইবরাহীম ছাহেব (রহ.) অন্যতম। অত্যন্ত ট্যালেন্ট, ইলমে শরীয়ত ও মা'রেফতের জগতে এক উজ্জ্বল ধ্রুব নক্ষত্র মুফতিয়ে আযম, শাইখুল হাদীস ইবরাহীম ছাহেব (রহ.) ১৯৩২ সালের গোড়ার দিকে ধোড়করা গ্রামের প্রখ্যাত আলেম, ওলী ও শাহ্ সুফী মুন্সি কলিমুল্লাহ্ (রহ.)-এর ঘরে সোনার চামচ মুখে ধারণ করে- এ ধরাপৃষ্ঠে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুন্সি কলিমুল্লাহ্ (রহ.) ও তাঁর মাতা মুহতারিমা জিনাতুন নেছা (রহ.) দু'জনেই ছিলেন ইনসানে কামেল ও ওলী।
বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন: বাল্যকাল থেকেই বালক ইবরাহীম অত্যন্ত মেধার অধিকারী ছিলেন। এতদ সত্ত্বেও তিনি কঠিন শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তিনি সারাক্ষণ ইলম চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে ভবিষ্যতে একজন প্রখ্যাত আলেম ও 'দ্বীনের দাঈ' হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা বাবা-মায়ের কাছেই অর্জন করেন। পরে ধোড়করা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। অতঃপর তিনি উচ্চতর শিক্ষার প্রত্যাশায় তদানীন্তন চট্টগ্রাম বিভাগের ঐতিহ্যবাহী ফেনী আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এ মাদ্রাসায় ভর্তির প্রাক্কালে মাদ্রাসার 'শফিকু ওস্তাদ' খ্যাত (আমার নানাজী) হযরতুল আল্লামা মুফতি আব্দুস সাত্তার ছাহেব (রহ.)-এর সান্নিধ্য লাভ করে জোর চেষ্টা-নিষ্ঠা সহকারে গভীর মনোযোগের সাথে পড়াশোনায় মশগুল হন। তাঁর দিকনির্দেশনায় তুখোড় মেধাবী ছাত্র ইবরাহীম অত্যাল্প সময়ের মধ্যে পুরো মাদ্রাসায় একজন আদর্শ ও তীক্ষ্ম মেধাবী ছাত্র হিসেবে সু-পরিচিতি লাভ করেন। পরে উক্ত মাদ্রাসার সকল আসাতিজায়ে কেরামের নেক নজরধন্য হয়ে তায়ালুম ও তাদাররুসে আরো গভীরতর মশগুল হন। তিনি প্রত্যেক শ্রেণিতে সকল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মার্কস পেয়ে মেধার স্বাক্ষর বহন করেন। এভাবে তিনি সুনাম-সুখ্যাতির পাল্লা ভারী করে ওস্তাদগণ, সহপাঠী ও মুরুব্বিগণের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ১৯৫২ সালে দাখিল ও ১৯৫৪ সালে আলিম জামাতে সারাদেশে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বোর্ড স্ট্যান্ড করার গৌরব অর্জনের ইতিহাস রচনা করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তাঁর আলিম পরীক্ষায় কুরআন বিষয়ে ঐতিহাসিক দালিলিক প্রমাণ্যের প্রেক্ষিতে বোর্ড চেয়ারম্যান অত্যাচার্য হয়ে সন্দেহবশত তাঁর ফলাফল স্থগিত করেন। পরে ফেনীর আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা উবাইদুল হক ছাহেব (রহ.)-এর হস্তক্ষেপে বোর্ড চেয়ারম্যানের সামনেই উক্ত বিষয়ে আবারও চমকপ্রদ লেখা উপহার দেন ইবরাহীম। এতে চেয়ারম্যান মহোদয় বিস্ময়াভিভূত হয়ে 'ভেরি ট্যালেন্ট' ছাত্রটির ফলাফল সানন্দে প্রকাশ করেন এবং তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদ করেন। এরপর মেধাবী ছাত্র ইবরাহীম আরো জোর চেষ্টা সহকারে পড়াশোনায় মগ্ন হয়ে ১৯৫৬ সালে ফাযিল পরীক্ষায় গোটা পাকিস্তানজুড়ে ফার্স্ট স্ট্যান্ড করে ইতিহাস গড়েন। এরই প্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে গোল্ড মেডেলে বিভূষিত করে। অতঃপর তিনি ১৯৫৯ সালে কামিল পরীক্ষায় হাদিস বিভাগে ফিল্থ বোর্ড স্ট্যান্ড করেন। জ্ঞানতৃষ্ণার উজ্জ্বল রবি ও অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আবু নঈম মো. ইবরাহীম ফেনী জেলার বিখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান শর্শদী দারুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে জ্ঞানসাগরের শীতল সুধা পান করেন।
অধ্যাপনা: তিনি ফাযিল জামাতে বোর্ড স্ট্যান্ড করার প্রেক্ষিতে তাঁর প্রিয় প্রতিষ্ঠান- ফেনী আলিয়ার আসাতিজায়ে কেরামের আহ্বানে ১৯৫৮ সালে উক্ত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে 'মুহাদ্দিস' হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ঐ মাদ্রাসার মুহাদ্দিসে দুয়াম, পরে শাইখুল হাদীস পদে আসীন হয়ে অতীব সুনামের সাথে ২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে ইলমে হাদীসের খেদমত করেন। পরে গভর্নিং বডির তীব্র অনুরোধে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইলমে হাদীসের বাগানে খেদমত করেন। তিনি একাধারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ৫৬ বছর ইলমে দ্বীনের প্রচার করেন। ইতোমধ্যে তাঁর দায়িত্ববোধ ও মহাত্ম্যের প্রেক্ষিতে গভর্নিং বডির অনুরোধে- উক্ত মাদ্রাসায় এক বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, এটা ছিলো তাঁর প্রাণপ্রিয় ওস্তাজ হযরতুল আল্লামা আবদুস ছাত্তার (সাতসতির হুজুর) রহ. এর ভবিষ্যদ্বাণীর ফলশ্রুতি।
আক্বীদা ও আধ্যাত্মিকতা: তিনি প্রাথমিক যুগে কওমী ঘরনার আলেম ছিলেন বলে জানা যায়। তবে শেষ জীবনে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতে ধাবিত হয়ে সুন্নীয়তের একজন বলিষ্ঠ সিপাহসালাহ্ হন বলে জানা গেছে। এজন্য কিছু ক্বওমী আলেম তাঁর প্রতি কিছুটা বিরূপ মন্তব্য করে তাঁর সাথে 'বাহাস-মুনাযেরা' আদাজল খেয়ে কাজ করেন- পরে সকলেই তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়ার ন্যূনতম সাহস হারিয়ে লেজগুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। মূলত, তাঁর ইলমের উজ্জ্বল হ্যাজাক লাইটের সামনে মোমবাতিগুলোর আলো নিষ্প্রভ হয়ে যায়। সবিশেষ উল্লেখ্য যে, তিনি ভারতের রিয়াসতের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের অন্যতম খলিফা, অধ্যক্ষ উবাইদুল হক ছাহেব (রহ.)-এর খাস মুরিদ ছিলেন।
খতিব ও ফতুয়া দান: ইলমে হাদীসের খেদমতের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে খেতাবতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাঁর উপজেলায় কবরুয়া জামে মসজিদ, ছাগলনাইয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ জামে মসজিদ, ফেনী শহর মমিন জাহান জামে মসজিদ ও ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়া ঐতিহাসিক শমশের গাজী ঈদগাহ ময়দানে দীর্ঘ ৪০ বছর খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। একই সময় বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার ও সেম্পোজিয়ামে মূল্যবান আলোচনা পেশ করতেন। সেই সাথে তিনি একজন অভিজ্ঞ মুফতি হিসেবেও সর্ব মহলের নিকট সুপরিচিত ছিলেন।
তাঁর মহতী ওস্তাদগণ: মাও: উবায়দুল হক রহ. (প্রিন্সিপাল হুজুর), মাও: আবদুস সাত্তার (সাতসতির আউয়াল ছাহেব হুজুর রহ.), মাও: দেলোয়ার র: (ফেনুয়ার হুজুর), মাও: মুহিব্বুর রহমান র: (ফেনুয়ার হুজুর), মাও: আবু বকর নেযামী র:, মাও: মুখলেছুর রহমান র: (পীর সাহেব), মাও: শামচুল হক র: (ছোট হুজুর), মাও: ইদরীস র: (ছিলোনীয়ার হুজুর), মাও: গোলাম রসুল র: (বারাহীপুরের হুজুর), মাও: নুর মোহাম্মদ আজম।





























