
ঈদ: আনন্দের চেয়েও বেশি কিছু
ঈদ মানে আমার কাছে শুধু আনন্দ-উৎসবই নয়, ঈদ মানে শহর থেকে গ্রামে ছুটে গিয়ে প্রিয়জনদের বুকে জড়িয়ে নেওয়ার প্রশান্তি—যা কল্পনাতীত এক আনন্দ। ঈদ-উৎসব কীভাবে আপনজনকে কাছে টেনে আনে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ঈদের দিনের কথা ভাবলেই শৈশবের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চাঁদরাতে মাটির ব্যাংক ভেঙে টাকার হিসাব করা—সারা বছরের ছোট ছোট সঞ্চয়ের ফল! তবে সব টাকা নিয়ে ঈদগাহে যাওয়া হতো না। মা কিছুটা রেখে দিতেন, যেন সারাদিন আনন্দের কমতি না হয়। সকালে ঈদগাহে যাবার পথে পকেটের টাকা শেষ হয়ে গেলে আবার বাড়ি ফিরে মায়ের আঁচল, বিছানার নিচ কিংবা তরিতরকারির ডালার মধ্যে লুকানো টাকা খুঁজে বের করতাম, বিকেলের ঘোরাঘুরি যাতে ঠিকঠাক চলতে পারে!
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পেত। সেইসব সোনালি দিন আজ খুব মিস করি—শুধু ঈদের আনন্দ নয়, সেই নিখাদ ভালোবাসার অনুভূতিগুলোও।
মোহাম্মদ অংকন
চাকরিজীবী
যান্ত্রিকতার ভিড়ে ঈদ আয়োজনে হৃদ্যতার ঘাটতি
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনে ঈদের আয়োজন যতই বৈচিত্র্যময় হোক, কোথাও যেন হৃদ্যতার এক অপূর্ণতা থেকে যায়।
শৈশবের ঈদ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি—ভোর সকালে ঈদের নামাজ আদায়, কবর জিয়ারত, প্রতিবেশীদের সাথে কুশল বিনিময়—সব মিলিয়ে দিনটি শুরু হতো হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে। তখন ঈদগাহে যাওয়ার আগ্রহই ছিল আলাদা, ‘আব্বুর সাথে ঈদগাহ যাবো’—এই অনুভূতি ছিল আবেগে ভরা। এখনো ঠিকই আব্বুর সাথেই ঈদের জামাতে যাই, কিন্তু সেই শৈশবের উচ্ছ্বাস যেন কিছুটা ম্লান।
আগে ঈদ ঘিরে প্রবাসী বা শহরের বাইরে থাকা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীরা বাড়ি ফিরতেন, বাড়ির আঙিনায় আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। এখন দেখা যায়, আমরা নিজেরাই ঈদের দু-একদিন আগে বাড়ি ফিরি, আবার ঈদের পরপরই কর্মস্থলের তাড়া। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সাথেই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় বেশি হয়, ডিজিটাল লেনদেনে সালামির আদান-প্রদানও হয়ে যাচ্ছে। একসময় সবাই মিলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান উপভোগ করতাম, আর এখন যার যার মোবাইল স্ক্রিনেই বিনোদনের জগৎ সীমাবদ্ধ।
সময়ের পরিক্রমায় ঈদ উদযাপনের ধরন বদলে গেছে, কিন্তু পারিবারিক বন্ধন ও হৃদ্যতার সেই ঘাটতিটা যেন থেকেই যাচ্ছে। তবুও প্রত্যাশা, প্রযুক্তির দুনিয়াতেও আমরা পরিবারের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ খুঁজে নেব, একসঙ্গে হাসিমুখে সময় কাটাব।
তানজিদ শুভ্র
তরুণ লেখক
প্রবাসে ঈদ যেন লবণ ছাড়া তরকারির মতো
পরিবার-প্রিয়জন ছাড়া ঈদ যেন সত্যিই লবণ ছাড়া তরকারির মতো—স্বাদহীন, আনন্দহীন। প্রবাসীদের জন্য ঈদ মানে নিজের আনন্দটুকু পরিবারের জন্য ত্যাগ করা, দূর থেকে তাদের হাসিমুখ দেখেই তৃপ্ত থাকার চেষ্টা।
প্রবাসীরা টাকা ইনকাম করে ঠিকই, কিন্তু ঈদ এলেই নিজেদের জন্য কিছু কেনার আগে হাজারবার ভাবে—পরিবারের জন্য পাঠানো টাকা ঠিকমতো পৌঁছেছে তো? দেশে থাকা প্রিয়জনদের হাসিমুখই যেন তাদের আসল ঈদ আনন্দ। অথচ নিজের ঈদ কাটে সেই পুরনো পোশাক আর নিত্যদিনের মতোই সাদামাটা খাবারে। অনেকের ঈদের দিনও অফিস বা কাজের ডিউটি থাকে, যেন ঈদও আর দশটা দিনের মতোই।
প্রবাস মানেই দুঃখের তরঙ্গ বেয়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পরিবারের স্বপ্নকে লালন করা। পরিবারের জন্য একজন প্রবাসী কতটা ত্যাগ স্বীকার করে, কতটা ধৈর্যশীল, উদার আর মহৎ হতে পারে—আমি নিজে প্রবাসে না এলে তা বুঝতাম না।
শত কর্মব্যস্ততার মাঝে ঈদের ছুটিতে লম্বা ঘুমই অধিকাংশ প্রবাসীর জন্য ঈদের দিনের মূল কর্মসূচি হয়ে যায়। ঈদের নামাজ শেষে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চেনা মুখগুলোর দেখা না পাওয়ার যন্ত্রণা, মায়ের হাতের রান্না না খেতে পারার আফসোস, বাবার স্নেহময় স্পর্শ না পাওয়ার হাহাকার—সব মিলিয়ে ঈদের আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
অনেকেই ভার্চুয়ালি দেশের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যুক্ত হন, কেউ কেউ চোখের জল আটকে রাখতে পারেন না। বুক ফাটা কষ্ট নিয়ে বিছানায় শুয়ে চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। দুপুর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে বন্ধুরা মিলে একটু আনন্দের খোঁজে বের হন—কোথাও কোনো পার্কে গিয়ে বসেন, একসঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই ফাঁকা সময়েও মনের ভেতরটা খালি খালি লাগে।
এভাবেই কেটে যায় প্রবাসীদের ঈদ—নিঃসঙ্গতার এক দীর্ঘ বেদনাময় দিন।
মো. জুবাইল আকন্দ
মালয়েশিয়া প্রবাসী
অনুভূতি ও একতার উৎসব
ঈদ আমার কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং একটি অনুভূতির নাম। শৈশবের ঈদ ছিল একান্ত মধুর, যেখানে আনন্দের কোনো শেষ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে ভোরে নামাজ পড়া, তারপর সবার সঙ্গে খাবারের টেবিলে বসে সুস্বাদু খাবার খাওয়া, নতুন জামা-কাপড় পরা, বড়দের থেকে ঈদ সালামি নেওয়া এই সব কিছু মিলিয়ে ঈদ ছিল এক জাদুকরী মুহূর্ত। ঈদ কার্ডে বন্ধুদের শুভেচ্ছা লেখা, মেহেদি দিয়ে হাত রাঙানো, সেই দিনটা যেন এক রঙিন উৎসবের মতো ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের আমেজ বদলে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আগমনে এখন ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময় প্রায় সবসময়-ই ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। অনলাইনে শপিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঈদের ছবি ও পোস্ট এগুলো এখন আমাদের ঈদ উদযাপনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই আধুনিকতা কিছু কিছু ক্ষেত্রে শৈশবের ঈদের সরলতা হারিয়ে ফেলেছে, তবে আবার আমাদের সম্পর্কের গভীরতা ও ভালোবাসা অটুট রেখেছে।
আসল আনন্দ তো তখন-ই আসে, যখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ঈদের দিনটা উপভোগ করা যায়। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো, তাদের মুখে হাসি দেখা, একে অপরকে দোয়া ও শুভেচ্ছা জানানো এটা-ই সত্যিকারের ঈদের আনন্দ। এই আনন্দ কখনো-ই সময়ের পরিবর্তন বা আধুনিকতার সাথে কমে যায় না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে নতুন এক মহিমা অর্জন করে। ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়, এটি আমাদের একতার, ভালোবাসার এবং মানবতার প্রতীক।
নওশীন ফারহান নওমী
শিক্ষার্থী
রঙিন শৈশবের ঈদ
ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই শৈশব। থাকবে না কোনো পড়াশোনা, সারাদিন ঘুরাঘুরি। ঈদ বলতেই মাথায় আসে ছোটবেলার স্মৃতি। আমি গ্রামে বড় হয়েছি। তাই ঈদের আনন্দটা তখন ছিল অন্যরকম। একটা সময় ছিলো ঈদ আসলেই ভাবতে থাকতাম কী জামা কিনবো, কী মেহেদী কিনবো, কার কার থেকে সালামি নিবো এসব। ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসতো আশেপাশের মানুষকে বারবার প্রশ্ন করতাম ঈদ আসতে আর কতদিন বাকি? এসব বলে বলে সবাইকে বিরক্ত করে ফেলতাম।
তারপর শুরু হতো ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে। ঈদের যখন আর দুই একদিন বাকি তখন থেকেই হইচই করতাম ঈদের চাঁদ কে আগে দেখতে পারে সেটা নিয়ে। ছোটবেলায় ঈদের সবচেয়ে মজার বিষয় ছিলো ঈদের জামা নিয়ে। জামাটা যত্ন করে লুকিয়ে রাখতাম। আশেপাশে অনেকেই আমার বয়সি ছিলো। ওরাও কেনাকাটা দেখানোর জন্য অনুরোধ করতো। তাও একপ্রকার জেদ ধরে বসে থাকতাম কাউকে দেখাবো না, দেখাতামও না। তখন ভাবতাম ঈদের জামা ঈদের আগে কেউ দেখে ফেললে ঈদ পুরনো হয়ে যায়। কেউ যদি ভুলে ও দেখে ফেলতো সেকি কান্না। জামা কেনার পর থেকেই রাতে চিন্তায় ঘুম আসতো না। জামাটা কখন পরবো, পরলে কেমন লাগবে, কোন ক্লিপটা ভালো মানাবে এসব নিয়ে।
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যা থেকে আবার শুরু হতো হাত ভর্তি মেহেদী দেওয়া। তখনো ছিলো কত হৈচৈ। কার আগে কে দিব তা নিয়ে। তারপর আসতো কাঙ্খিত সেই ঈদের দিন। আম্মুর ডাকে সকাল সকাল ঘুম ভাঙতো। সকালবেলা ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা, নতুন জামা পরে সবাইকে দেখানো, বড়দের থেকে সালামি নেওয়া, কার কত সালামি হয়েছে সেটা দেখা আরও কত কী!
এগুলো এখন সবই স্মৃতি। বদলে গেছে ঈদ, বদলে গেছে জীবন। যাপিত জীবনের বিশাল একটা অংশ এখন ব্যস্ততা, সোশ্যাল মিডিয়া। বড় হওয়ার পর এমন আনন্দ আর পাইনি। এখন ছোটরা আনন্দ করে আর আমি তাকিয়ে দেখি আর ভাবি অনেক বড় হয়ে গিয়েছি...।
নুসরাত জাহান আখন্দ
শিক্ষার্থী
তারুণ্যের ঈদ বদলে গেছে জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। শৈশবের মতো সারাদিন হাসি-ঠাট্টা, ঘোরাঘুরি আর আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া এখন আর হয় না। তবু ঈদ মানেই তো কাছের মানুষদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। ব্যস্ততার মাঝেও ঈদের দিনে একটুখানি হাসি, একটুখানি উষ্ণতা থাকুক—এই প্রত্যাশা সবার।







































