
জাহাঙ্গীর সরদার, বিশেষ প্রতিনিধি:
ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই যশোরের চাঁচড়া–বাবলাতলা এলাকায় শুরু হয় এক বিশেষ কোলাহল। ঠেলাগাড়ি, সাইকেল, পিকআপভ্যান, ট্রাক—সব ভরে আছে ছোট ছোট পানিভর্তি ড্রামে। ড্রামের ভিতর ছটফট করছে হাজার হাজার চারা মাছ। এ যেন এক প্রাণবন্ত নদীর অংশ, সাময়িকভাবে এসে থেমেছে বাজারে।
চাঁচড়া–বাবলাতলা চারা মাছের বাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চারা মাছের পাইকারি কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে চারা মাছের কেনাবেচা। বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, সিলভার কার্পসহ নানান প্রজাতির পোনা মাছ। মাছের গায়ের রঙে, পানির ছটায়, বিক্রেতা-ক্রেতার হাঁকডাকে যেন তৈরি হয় আলাদা এক উৎসবের পরিবেশ।
বাজারের এক প্রবীণ বিক্রেতা, ফারুক হোসেন বলেন, "প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই বাজারে চারা মাছ বিক্রি করছি। একসময় হাতে গোনা কয়েকজন থাকলেও এখন প্রতিদিন কয়েকশ ব্যবসায়ী ও ক্রেতা এখানে আসেন।"
মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী তৌহিদ হোসেন বলেন , এখানে ২২০ জন খামারী ব্যবসায়ী আছে "এ বাজার শুধু বাণিজ্য নয়, হাজারো মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এর উপর। প্রতিদিন প্রায় কয়েক শত মানুষ এখানে কাজের সুযোগ পান।"
যশোর ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেও ক্রেতারা এখানে ভিড় জমান। অনেকে রাতভর ভ্যান বা ট্রাকে করে এসে ভোরে মাছ কেনেন, তারপর আবার দ্রুত রওনা দেন নিজেদের গন্তব্যে।
সাতক্ষীরা থেকে খামারি তরিকুল ইসলাম বলেন, "এখান থেকে চারা মাছ কিনে নিয়ে গেলে টিকে থাকার হার বেশি। দামও তুলনামূলকভাবে কম।"
মৌসুমভেদে এখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হয়। বর্ষাকাল ও শীতের শুরুতে চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। শুধু বিক্রেতা-ক্রেতারাই নন, প্রতিদিন কয়েক শত শ্রমিক এ বাজার থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, পরিবহন এবং সরকারি সহায়তা পেলে চাঁচড়া–বাবলাতলা বাজার থেকে ভবিষ্যতে দেশের চারা মাছ রপ্তানির পথও খুলে যেতে পারে।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে এই বাজার যেন নতুন দিনের নতুন প্রাণ পায়। মাছের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মানুষের হাঁকডাক আর গায়ের ভিজে কাদা—সব মিলিয়ে চাঁচড়া–বাবলাতলা বাজার এক অনন্য রঙিন ভোরের গল্প শোনায় প্রতিদিন।





























