
শেরপুর প্রতিনিধি:
শেরপুরে বিপুল পরিমাণ সার পাচার ও কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) ১৫ জন ডিলার এবং তাদের ৫ জন সহযোগীসহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে শেরপুর সদর থানায় এই মামলাটি করেন। তবে মামলা করার পর থেকে তিনি নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ডিলারদের চাপের মুখে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের এই দুর্ভোগ ও জীবন ঝুঁকির বিষয়টি প্রকাশ করেন অভিযুক্ত বাদী ও কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন।
আসামিদের তালিকা
মামলার প্রধান আসামিরা হলেন শেরপুর সদরের বিসিআইসির সার ডিলার—রাশেদুল ইসলাম, সুফিয়া বেগম রিপন, রফিকুল ইসলাম, সুবর্ণা সাহা রায়, মীর দেলোয়ার হোসেন, মরিয়ম আক্তার মুন্নী, ফরহাদ আলী, ইলিয়াস আলী, তাপস নন্দী, কামরুন নাহার হাশেম, সিরাজুল ইসলাম, ছামিদুল ইসলাম ফারাজী, বোরহান উদ্দীন, রেজাউল করিম এবং মাযহারুল ইসলাম।
এছাড়াও চন্দেরনগরের সাঈদ ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, শেখহাটির লাকী এন্টারপ্রাইজের পরিচালনাকারী মনিরুজ্জামান মনির, শেরপুর নিউমার্কেটের গৌরব ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী প্রশান্ত সাহা রায়, থানা মোড়ের মেসার্স মল্লিক স্টোরের পরিচালনাকারী রতন মিয়া এবং ফকিরগঞ্জ বাজারের আব্দুল মান্নান ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী বাদশা মিয়াকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারের বিবরণ ও জালিয়াতি
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ সার পাচার ও কালোবাজারে বিক্রি করেছেন। জালিয়াতি করা সারের বিবরণ:
ইউরিয়া: ৪,৪১২ টন (মূল্য: ১১ কোটি ৯১ লাখ ৪০ হাজার টাকা)
ডিএপি: ৮২১ টন (মূল্য: ১ কোটি ৭২ লাখ ৪১ হাজার টাকা)
টিএসপি: ১৩৪ টন (মূল্য: ৩৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা)
এমওপি: ১৭২ টন (মূল্য: ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা)
সর্বমোট ১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার (প্রায় ১৪ কোটি) টাকার সার পাচার করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং প্রান্তিক কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হয়।
তদন্তে দেখা যায়, ভাউচারে খুচরা বিক্রেতাদের নামে বিপুল পরিমাণ সার বিক্রি দেখানো হলেও বাস্তবে তা দেওয়া হয়নি। যেমন— জেসমিন এন্টারপ্রাইজের নামে ৮০০ বস্তা ইউরিয়া বিক্রির ভাউচার করা হলেও বিক্রেতা জানিয়েছেন তিনি ৩০০ বস্তাও পাননি। একইভাবে কুসুমহাটী বাজারের খুচরা বিক্রেতা রঞ্জিত বাবুর নামে ২,৩২৫ বস্তা সার বিক্রির হিসাব দেখানো হলেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ১,০০০ বস্তার কিছু বেশি।
একাকী লড়াই ও হেনস্তার শিকার কর্মকর্তা
কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, সার পাচারের সত্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে গত এক মাস ধরে তিনি চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন। নিজ বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহল থেকে তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি; উল্টো তাঁকে মাত্র ২০ দিনে ৮ বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও ঘুষ দাবির মিথ্যা অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তিনি বলেন,
"পুলিশ বিভাগ ছাড়া এই কঠিন সময়ে আমাকে কেউ সহায়তা করেনি। অর্পিত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রের স্বার্থে আমি মামলা করেছি। এখন বলা হচ্ছে আমি নাকি সরকারকে বিব্রত করতে মামলা করেছি! একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, আমি কেবল তা প্রতিহত করেছি। এখন আমি চরম জীবনের ঝুঁকিতে আছি।"
যা বলছেন ডিলার ও ভুক্তভোগীরা
অনিয়মের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা। মীম এন্টারপ্রাইজের মালিক আকবর আলী জানান, সময়মতো সার না পেয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনছেন।
অন্যদিকে, প্রধান অভিযুক্ত ডিলার রাশেদুল ইসলাম অসুস্থতার কথা বলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাছনা ট্রেডার্সের আরিফুল ইসলাম সাব-ডিলারদের ওপর দায় চাপিয়ে দাবি করেন, "আমাদের অন্যায়ভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।"
শেরপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নিলু জানান, মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন। শেরপুর সদর থানার ওসি সোহেল রানা জানান, মামলার তদন্ত চলছে, বেশ কিছু রেজিস্টারপত্র জব্দ করা হয়েছে। আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন।
তবে শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, মাঠপর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ যাচাই ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনা আসার আগেই কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন মামলাটি করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী মামলা করতে প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন ছিল।
ছবি ক্যাপশন: শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসারের কার্যালয়।




























